তাপস মহাপাত্র
রাষ্ট্রীয় একতা দিবস, বা ‘ন্যাশনাল ইউনিটি ডে’, প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর পালিত হয় ভারতের ঐক্যের কারিগর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে। এই দিনটিতে স্বাধীন ভারতের জাতীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে স্মরণ করা হয়। যার মধ্য দিয়ে ভারতের সার্বভৌমত্ব, শান্তি ও অখণ্ডতা রক্ষায় ঐক্যের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।
ভারত সরকার ২০১৪ সালে সরদার প্যাটেলের জাতি গঠনের প্রতি অসামান্য অবদানকে সম্মান জানাতে এই দিনটি পালনের ঘোষণা করে। পরের বছর, ৩১ অক্টোবর ২০১৫-র রাষ্ট্রীয় একতা দিবসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত’ কর্মসূচির সূচনা করেন। এর উদ্দেশ্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও ভাষাগত বন্ধন আরও বলিষ্ঠ করা। এরপর থেকে একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রক, রাজ্য সরকার, বিদ্যালয়, কলেজ ও যুব সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশজুড়ে ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে থাকে। এ বছর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ১৫০-তম জন্মবার্ষিকী হওয়ায় জাতীয় ঐক্য দিবসের উদযাপন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
স্বাধীন ভারতের প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী ও গৃহমন্ত্ৰী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল স্বাধীনতার পর দেশের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর ওপর ছিল দেশের প্রায় ৫৬০-টিরও বেশি রাজ্য বা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল-কে সংযুক্ত করার দায়িত্ব। এই রাজ্যগুলির আওতায় তখন ভারতের মোট ভূখণ্ড ও জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। ভারত স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী এসব রাজ্যের শাসকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন তাঁরা ভারতে যোগ দেবেন, পাকিস্তানে যোগ দেবেন, না স্বাধীন থাকবেন। সর্দার প্যাটেল কূটনীতি ও দৃঢ় প্রশাসনিক ব্যবস্থার মেলবন্ধন ঘটিয়ে বিভাজনকে রুখতে পেরেছিলেন। এর ফলে, আধুনিক ভারতের অখণ্ডতা নিশ্চিত হয়।

তাঁর এই প্রচেষ্টা দেশে সম্ভাব্য বিভাজন রোধ করে ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করে। বিভিন্ন সংকটময় বিভাজনের সময় দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে তাঁর দৃঢ় নেতৃত্ব নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছিল। তিনি দেশের ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে এক সবল পরিকাঠামো হিসেবে ‘অল ইন্ডিয়া সার্ভিসেস’-এর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
“এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত” বা ইবিএসবি উদ্যোগ ৩১ অক্টোবর, ২০১৫-এ সরদার বল্লভভাই প্যাটেলের ১৪০-তম জন্মবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঘোষিত এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। এই কর্মসূচি সর্দার প্যাটেলের ঐক্যবদ্ধ ভারতের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বহন করে। এটি দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে উৎসাহিত করে এবং ভারতের বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যকে উদযাপন করে।
এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য—
নাগরিকদের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করা
রাজ্যগুলির মধ্যে পরিকল্পিত পারস্পরিক সংযোগের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যকে সবল করা
ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির প্রদর্শন ও প্রশংসা করা
স্থায়ী অংশীদারিত্ব গঠন করা
বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে পারস্পরিক শিক্ষা ও শ্রেষ্ঠ অনুশীলন বিনিময়কে উৎসাহিত করা

“এক ভারত শ্রেষ্ঠ ভারত” কর্মসূচি বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণাকে বাস্তব রূপ দেয়। এটি ভাষা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার বিনিময়ের মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় একতা দিবসের বার্তা শুধু একটি দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, সারা বছর ধরে এক অবিচ্ছিন্ন জাতীয় সংহতির আন্দোলনের রূপ নেয়। ২০২৫ সালকে জাতীয় উৎসব হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে। এই মাইলফলক সরদার প্যাটেলের ভাবধারার স্থায়ী প্রাসঙ্গিকতাকে নতুন করে স্মরণ করায়, বিশেষত এমন সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে ঐক্য ও সামাজিক সম্প্রীতি নানা কাঠিন্যের সম্মুখীন।
