কুশল চক্রবর্তী
সদ্য প্রকাশিত আয়কর দপ্তরের এক রিপোর্ট বলছে, ২০২৫ সালের আয়কর সংগ্রহে ৭০ বছরের অধিক বয়সের করদাতারা আরও বেশী করে কর দিয়েছেন। অর্থাৎ কিনা ২০২১ সালে ৭০ বছর বা তার বেশী বয়সের করদাতাদের আয়কর দেবার পরিমাণটা ছিল ২৫৯৭০ কোটি টাকা। তা এবার, মানে ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১৬২৪ কোটি টাকায়।
কিছুদিন আগেই সরকার রেলের আয়ের ফিরিস্তি দিতে গিয়ে বলেছেন বিগত পাঁচ বছরে ভারত সরকার ৩১.৩৫ কোটি সিনিয়ার সিটিজেন ট্রেন যাত্রীকে প্রবীণ লোকদের প্রদেয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে ৮৯১৩ কোটি টাকা লাভ করেছে। অর্থাৎ এটা বলা যেতেই পারে যে, সরকারের কাছে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়ানো মানুষগুলো সরকারি আয়ের অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকার অবশ্য এই বয়স্ক লোকেদের অধিক আয়কর দেবার কারণ হিসাবে সিনিয়ার সিটিজেনদের অধিক আয়ের সংস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন। এবং বলেছেন, বিগত দশ বছরে সরকারি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সাফল্যের কারণেই তারা অধিক আয় করতে সক্ষম হয়েছেন। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, আজকের যে ওয়েলফেয়ার স্টেটের চিন্তা, তা এসেছিল জার্মানির অট্ট ভন বিসমার্কের ১৮৮০ সালের এক চিন্তাধারা থেকে। তিনি বার বার বলেছিলেন ওয়েলফেয়ার স্টেটে মানুষের স্বচ্ছন্দ ও সুখ একটা বড় জিনিস। ইতিহাস কিন্তু বলে ভারতবর্ষের সম্রাট অশোকও এই নীতিতে বিশ্বাস করতেন। আজকের এই ৭০ অতিক্রান্ত মানুষগুলোর অবস্থা এক বার ভেবে দেখুন, কত কষ্ট করে তারা তাদের সোনার দিনগুলোতে টাকা জমিয়ে ছিলেন !
বৃদ্ধ বয়সে একটু নিশ্চিন্ত জীবনযাপনের জন্য, কিন্তু আজ তারা আয়কর দেবার চিন্তায় মাথা খুটছেন। তাকিয়ে দেখুন, বিগত বছরগুলোতে কি ভাবে ওষুধের দাম বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে বিগত পাঁচ বছরে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম ৬০% এর বেশী বেড়েছে। আর হাসপাতাল তো এখন সঠিক চিকিৎসা না শেয়ার লগ্নিকারীদের অধিক মুনাফার কেন্দ্র তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। হাসপাতালের বিল এখন যে কোনও লোকের অসুস্থতার কারণ হতে পারে। আর যে মানুষগুলো হয়ত ৪০ বছর অবধি কোনও ওষুধের প্রয়োজনই বোধ করত না, তাকে ৬০ পরবর্তী বয়সে এসে কী পরিমান ওষুধের দাসত্ব গ্রহণ করতে হয়েছে, তা বলে বোঝানো যাবে না। ভারতবর্ষের মানুষের গড় আয়ু হয়ত বেড়েছে কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে শরীর ঠিক রাখার ওষুধের চাহিদা। এমনকি সরকার এখনও অবধি মেডিক্যাল ইনস্যুরেন্সেও জি এস টি আদায় করছেন।
একটু সমাজের দিকে চাইলেই বুঝতে পারবেন আজকের সমাজের একটা বড় অভিশাপ বৃদ্ধ বয়সে একাকীত্ব আর অনিশ্চয়তা। এই সময় দরকার সঠিক পরিচর্যার। আর এই পরিচর্যার মূল্য এখন দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। একে তো সর্বত্র বয়স্ক লোকেদের নিরাপত্তার অভাব, তার সঙ্গে দেখা দিচ্ছে তাকে শুশ্রূষাকারী মানুষের বিশ্বাস হন্তার প্রবণতা। এই সময় এই মানুষগুলোর দরকার কিছুটা হলেও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। এই ভেবেই না তারা যৌবনে অনেক সুখ আর আনন্দ বিসর্জন দিয়ে পয়সা জমিয়ে ছিল। আজ সরকারি করের বোঝা তাদের আরেক বার দুশ্চিন্তার দিনগুলোতে নিয়ে যাচ্ছে না কী ! সদ্য প্রকাশিত একটি সমীক্ষা বলছে ভারতীয় নাগরিকদের গড় বয়স এখন ৭২ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে। তাহলে এটা কি বলা যায় না যে ৭০ বছর অতিক্রান্ত মানুষেরা তাদের জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন ? আর সে কথা মনে রেখেই হয়ত সরকার আইন করেছেন ৭৫ বছর অতিক্রান্ত দেশবাসীর আর আয়কর হিসাব দেবার দরকার নেই। তারাই আবার কি করে ৭০ অতিক্রান্ত দেশবাসীর আয়কর আদায়ে এত উৎসাহিত হয়ে পড়ে। সত্যি সেলুকাস এ বড় বিচিত্র দেশ !
