ওঙ্কার ডেস্ক: ধর্মতলার ২১ জুলাইয়ের বার্ষিক সভা ঘিরে রাজনৈতিক আবহ নতুন মোড় নিল কলকাতা হাই কোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে। অতীতে এই সভার প্রসঙ্গ বহুবার আদালতের দরজায় পৌঁছেছে কখনও বিজেপি সভার অনুমতির প্রসঙ্গে তুলনা হিসেবে, কখনও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার যুক্তিতে। তবে এবার প্রথমবারের মতো জনজীবনের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হওয়ার প্রসঙ্গটিকে কেন্দ্র করে আদালতের পর্যবেক্ষণ সামনে এল, যা রাজনৈতিক মহল ও নাগরিক সমাজ দুই ক্ষেত্রেই নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃহস্পতিবার কলকাতা হাই কোর্টে বামপন্থী আইনজীবী সংগঠনের দায়ের করা মামলার শুনানিতে বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষ স্পষ্ট বার্তা দেন শাসক তৃণমূলের আইনজীবীদের উদ্দেশে। তিনি বলেন, ‘‘পরের বছর থেকে শহিদ মিনার, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড বা অন্য কোনও বিকল্প জায়গায় সভা করা যায় কি না, তা ভেবে দেখতে হবে”। যদিও রায়ের লিখিত নির্দেশে সরাসরি এই বিষয়টি উল্লেখ নেই, তবে পুলিশের ওপর দায়িত্ব ছাড়াই তিনি স্পষ্ট করে দেন সোমবারের সভার দিন সাধারণ মানুষ যাতে অযথা সমস্যায় না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে হবে কলকাতা পুলিশকে। ফলে ২১ জুলাইয়ের সভার ইতিহাসে প্রথমবার আদালতের শর্ত কঠোর আকারে ধরা পড়ল।
অতীতে ২০১৬ এবং ২০২৩ দুই বারই বিজেপি ধর্মতলায় সভার অনুমতি পেতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল। সেই সময় দুই মামলাতেই ২১ জুলাইয়ের সভার উদাহরণ তুলে ধরে বিজেপি দাবি তোলে, গণতান্ত্রিক অধিকার সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। সেবার আদালত বিজেপির যুক্তিকে মর্যাদা দিয়ে সভার অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু এ বারের মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণের মূল ফোকাস সরে এসেছে জনসাধারণের ভোগান্তির দিকে যা রাজনৈতিক মিছিল-মিটিং সংস্কৃতির জন্য এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে বলেই মনে করছেন অনেকে।
তৃণমূল নেতৃত্ব এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় স্পষ্ট তাঁদের অস্বস্তি। দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ অবশ্য সরাসরি আদালতের পর্যবেক্ষণ নিয়ে মন্তব্য না করে শুধু বলেছেন, ‘‘আদালতের উপর আমার কিছু বলার নেই”। তবে তাঁর কথায় মিশে আছে আক্ষেপের সুর ‘‘২১ জুলাই কোনও সাধারণ কর্মসূচি নয়, তাই একে আর পাঁচটা মিটিং-মিছিলের সঙ্গে মেলানো চলে না”।
অন্যদিকে বিজেপি মুখপাত্র রাজর্ষি লাহিড়ীর সোজাসাপটা মত, ‘‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিয়ম সকলের জন্যই সমান হওয়া উচিত”। সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও বলছেন, ‘‘২১ জুলাইয়ের সভার বিরোধিতা নয়, কিন্তু গণতান্ত্রিক নিয়ম সবার জন্য এক হওয়া উচিত”। সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়ও আদালতের পর্যবেক্ষণকে যুগান্তকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন ‘‘কাজের দিনে রাজনৈতিক কর্মসূচি হলে শহরের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। আদালতের পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানানো উচিত”।
এ প্রসঙ্গে সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া অনেকের মনেই সাড়া ফেলেছে, ‘‘বছরের পর বছর ধরে একই চিত্র। যদি আদালতের হস্তক্ষেপে সেই ছবিটা বদলায়, তাতে মঙ্গলই হবে”। নাগরিক সংগঠনগুলিও আদালতের পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করছে। কলকাতা-হাওড়া অফিসযাত্রী সমিতির সভাপতি সুবীর গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘রাস্তা আটকে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাংলার সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয় সাধারণ মানুষের। আদালতের নির্দেশ থেকে রাজনৈতিক দলগুলির শিক্ষা নেওয়া উচিত”।
সোমবার ধর্মতলার রাজপথে ফের নামবে লাখো মানুষের মিছিল, শহরজুড়ে তৃণমূলের মহাসভা। এবার নজর প্রশাসনের দিকে আদালতের শর্ত মেনে শহরের স্বাভাবিক ছন্দ কতটা বজায় থাকে, কতটা অবাধ থাকে অফিসযাত্রী থেকে পথচলতি মানুষের গন্তব্যের রাস্তা। এই ছবি বদলাবে কি না, তা ঠিক করবে আগামী বছরের ২১ জুলাই-ও।
