তাপস মহাপাত্র
হুগলি জেলার সিঙ্গুর আর পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম, কৃষিজমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অদবসান ঘটেছিল। তৃণমূলের ব্যানারে এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তখন তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে তরুণ তুর্কি নেতা। সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের ছোট গাড়ি প্রকল্প এবং নন্দীগ্রামে ইন্দোনেশিয়া-ভিত্তিক সেলিম গ্রুপের প্রস্তাবিত রাসায়নিক হাব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উত্তপ্ত বাংলার রাজনীতি।
সেই সময়ে, ২০০৭ সালের দিকে, সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের ছোট গাড়ি প্রকল্প এবং নন্দীগ্রামে ইন্দোনেশিয়া-ভিত্তিক সেলিম গ্রুপের প্রস্তাবিত রাসায়নিক হাব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলনে উত্তপ্ত বাংলার রাজনীতি। সেটা ২০০৭ সাল। সিঙ্গুরের আন্দোলনটি ছিল আরও বেশি আলোচিত। সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যিনি পশ্চিমবঙ্গে প্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে তৎকালীন প্রধান বিরোধী মুখ ছিলেন। তবে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের প্রতি সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ভোটারদের মধ্যে যে গণ-ঘৃণা তৈরি হয়েছিল, তার আসল পরিবর্তনকারী ঘটনাটি ছিল নন্দীগ্রামের অংশগ্রহণকারী ১৪ জন নিহত হওয়ার পর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সিঙ্গুর আন্দোলনের নেতৃত্ব সামনে থেকে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি নন্দীগ্রাম আন্দোলনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাঁর তৎকালীন বিশ্বস্ত সৈনিক শুভেন্দু অধিকারীর ওপর।
তখন নন্দীগ্রামে দুর্গ ধরে রাখার জন্য শুভেন্দু অধিকারীর কাছে কাজটি সহজ ছিল না। প্রথম চ্যালেঞ্জটি ছিল, নন্দীগ্রাম সেসময় কার্যত চারদিক থেকে সিপিএমের একনিষ্ঠ ক্যাডার বাহিনী মুঠোয় ছিল। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন তমলুকের তৎকালীন তিনবারের লোকসভা সদস্য লক্ষ্মণচন্দ্র শেঠ, যিনি তখন নন্দীগ্রামসহ সমগ্র তমলুক অঞ্চলে চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি ছিল ভূমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রশাসনিক চাপ, কারণ বিশাল পুলিশ বাহিনীও চারদিক থেকে নন্দীগ্রামকে ঘিরে রেখেছিল। তবে, এই সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যেও শুভেন্দু অধিকারী নন্দীগ্রামের গ্রামবাসীদের সফলভাবে একত্রিত করে আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলে যাওয়ার সমস্ত পথ বন্ধ করে দেন। পুলিশ বাহিনী ও সিপিএম-কে নন্দীগ্রামে প্রবেশ করতে বাধা দিয়ে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান। একই সঙ্গে, তিনি নন্দীগ্রাম আন্দোলনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কিছু উগ্র-বামপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থনও পেয়ে যান।
২০০৭ সালের ১৪ মার্চ পুলিশের গুলিতে ১৪ জন গ্রামবাসী নিহত হন। পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের পতনের সূচনা হয়েছিল সেইদিন। পুলিশের গুলি চালনায় সমগ্র রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। যেখানে বুদ্ধিজীবী, তারকা এবং সুশীল সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে সামিল হন।
এরপর আসে ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচন, যেখানে কংগ্রেস এবং তৃণমূল কংগ্রেস বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। শুভেন্দু অধিকারী তমলুক লোকসভা থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন। সেই নির্বাচনে তিনি সিপিএমের লক্ষ্মণচন্দ্র শেঠকে ১ লক্ষ ৭০ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করেন। তারপর থেকে তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তিনি তমলুক লোকসভা থেকে পুনরায় নির্বাচিত হন। তবে, ২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেদনু অধিকারীকে রাজ্যের মন্ত্রিসভায় চেয়েছিলেন। তখন তিনি নন্দীগ্রাম বিধানসভা কেন্দ্র থেকে জিতে এসে রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী হন।
রাজ্যের পরিবহন মন্ত্রী হিসেবে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের রাষ্ট্রীয় পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। বিভিন্ন রাজ্য পরিবহন সংস্থায় জ্বালানি-সাশ্রয়ী এবং পরিবেশ-বান্ধব বৈদ্যুতিক বাস চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেই সময়ে, শুভেন্দু অধিকারী তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে মনে করা হত। তবে, ২০১৯ সাল থেকে, বিশেষ করে সেই বছরের লোকসভা নির্বাচনের আগে, দলের নেতৃত্ব এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উভয়ের সঙ্গেই তাঁর মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। সে সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভাইপো ও দলের লোকসভা সদস্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দলের সাংগঠনিক ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এমনকি রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তেও প্রভাব পড়তে থাকে অভিষেকের মতামত। যা তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন প্রবীণ নেতাকে অবহেলা করা হচ্ছে বলে গুঞ্জন ওঠে।
২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর শুভেন্দু অধিকারী এবং তৃণমূল কংগ্রেস নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য আরও বেড়ে যায়। সেবার লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয়লাভ করে বিজেপি। এটা বিজেপির একটা বড় সাফল্য ছিল এই রাজ্যে। এরপর শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই অভাবনীয় নির্বাচনী সাফল্যের কারণ হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক নীতি এবং রাজ্য সরকারের ত্রুটিপূর্ণ প্রশাসনিক নীতির প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন।
২০২০ সালে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট কুশলি সংস্থা হিসেবে ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা আই-প্যাক-কে নিযুক্ত করেন। দলের ভোট কুশলি সংস্থা হিসেবে কাজ করার পরিবর্তে আই-প্যাক শুভেন্দু অধিকারীর বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে শুরু করে, যা তিনি মেনে নিতে পারেননি। অবশেষে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে, তিনি রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বিধায়ক উভয় পদ থেকেই পদত্যাগ করেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে বিজেপিতে যোগ দেন। ২০২১ সালে তার নিজ নির্বাচনী এলাকা নন্দীগ্রাম থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ সংঘাত শুরু হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নন্দীগ্রাম আসনে দাঁড়ান। বাংলার রাজনীতিতে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। সেবার ভোটে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে যান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও বিজেপি মাত্র ৭৭টি আসনে জয়লাভ করে। প্রত্যাশায় না পৌঁছোতে পারলেও শুভেন্দু অধিকারীকে বিধানসভায় বিরোধী দলের নেতা করে বিজেপি।
শুভেন্দু অধিকারীর আন্দোলনের অভিমুখ হয়ে ওঠে তৃণমূল সরকারের সার্বিক বিরোধীতা। চাকরির বিনিময়ে টাকা, হিন্দুদের উপর অত্যাচার, সন্দেশখালিতে নারী নির্যাতন এবং সবশেষে কলকাতার আর. জি. কর কাণ্ডের মতো জ্বলন্ত ইস্যুগুলি নিয়ে গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। রাজ্য জুড়ে চলে তাঁর রাজণৈতিক কর্মকাণ্ড। সমস্ত জনসভায় তিনি সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালাতে থাকেন। এঁদের তিনি পশ্চিমবঙ্গের “দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের” স্তম্ভ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে, বিধানসভার অধিবেশন চলাকালীন তিনি সভার ভেতরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এই আক্রমণ জারি রাখেন। বিধানসভার ভেতরে আক্রমণাত্মক ভূমিকার জন্য তৎকালীন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বেশ কয়েকবার বিধানসভা থেকে সাসপেন্ডও করেছিলেন। তবে, সাসপেন্ড থাকা সত্ত্বেও শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভা চত্বর ছেড়ে যাননি। অন্যান্য বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর প্রতিবাদ চালিয়ে গেছেন। একইসঙ্গে তিনি শুধু তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকা নন্দীগ্রামেই নয়, সমগ্র পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় বিজেপির সাংগঠনিক শক্তিকে অত্যন্ত দুর্ভেদ্য করে তোলেন।
২০২৬-এ এই রাজনৈতিক অধ্যায়ের ক্লাইমেক্স। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের কেন্দ্র ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন শুভেন্দু। যা তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারে কার্যত বাজি রাখা বলা চলে। কিন্তু এখানেও সফল হন শুভেন্দু। ঘরের মেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর ঘরে হারিয়ে শুভেন্দু অধিকারী উঠে আসেন রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষে।