ওঙ্কার ডেস্ক: তৃণমূল কংগ্রেসের সাম্প্রতিক অডিট রিপোর্টকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে জমা দেওয়া দলের হিসাবপত্রে দেখা গিয়েছে, গত দু’টি অর্থবর্ষে বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ার খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে শাসকদল। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর দলের আর্থিক ব্যয়, নির্বাচনী প্রচারের ধরন এবং দলীয় তহবিলের ব্যবহার নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজনৈতিক মহলে।
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ার জন্য খরচ হয়েছিল ৫৬.৩৩ কোটি টাকা। পরবর্তী অর্থবর্ষ অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে এই খাতে আরও ৩৭.৩৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দুই বছরে আকাশপথে যাতায়াত এবং নির্বাচনী প্রচারের জন্য দলের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৯৩.৬৮ কোটি টাকা।
বিশেষভাবে নজর কেড়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের হিসাব। ওই বছর ছিল লোকসভা নির্বাচনের বছর। রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃণমূলের মোট নির্বাচনী ব্যয় ছিল ১৩৭.৫৮ কোটি টাকা। তার মধ্যে প্রায় ৩৭.৩৪ কোটি টাকাই ব্যয় হয়েছে বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ার পিছনে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রচারের মোট ব্যয়ের প্রায় ২৭ শতাংশই গিয়েছে আকাশপথে যাতায়াতের জন্য।
একই সঙ্গে দলের আয় ও ব্যয়ের পরিসংখ্যানেও বড় পরিবর্তনের ছবি ধরা পড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দলের মোট আয় ছিল ২১৯.৩৫ কোটি টাকা, অথচ ব্যয়ের পরিমাণ পৌঁছেছে ২২৭.৫৯ কোটিতে। ফলে বছরের শেষে ৮.২৪ কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ঠিক আগের অর্থবর্ষে দল ৪১৪.৯১ কোটি টাকার উদ্বৃত্ত দেখিয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ অনুদানের পরিমাণে বড়সড় পতন। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে যেখানে দলের মোট অনুদান ছিল ৬১৮.০৮ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা নেমে এসেছে ১৮৪.০৮ কোটিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অনুদান কমেছে ৪৩৪ কোটিরও বেশি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ইলেক্টোরাল বন্ড ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার প্রভাব এর পিছনে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ পূর্ববর্তী তিন অর্থবর্ষে ইলেক্টোরাল বন্ডের মাধ্যমে তৃণমূলের আয় হয়েছিল প্রায় ১,৬১০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দলের প্রাপ্ত অনুদানের মধ্যে কর্পোরেট সংস্থাগুলির কাছ থেকে এসেছে ১৫.৩৫ কোটি টাকা, ব্যক্তি অনুদান ১৫.১৭ কোটি টাকা এবং বিভিন্ন ট্রাস্ট ও ফার্মের কাছ থেকে এসেছে ১৫৩.৫০ কোটি টাকা।
তবে ঘাটতির হিসাব থাকলেও দলের আর্থিক সঞ্চয়ের চিত্র যথেষ্ট শক্তিশালী বলেই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল ৬২৫.৭৯ কোটি টাকা। ব্যাংক ব্যালান্স, নগদ অর্থ ও চেক মিলিয়ে মোট চলতি সম্পদের পরিমাণ ছিল ৬৮১.১২ কোটি টাকা। পাশাপাশি স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিটে ছিল আরও ২৫০.৭৭ কোটি টাকা।
এই বিপুল আর্থিক সঞ্চয়ের পরও দলের অভ্যন্তরে অর্থসংকট নিয়ে যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দলীয় কর্মীদের আইনি সহায়তা, জামিনের খরচ বা সাংগঠনিক প্রয়োজন মেটাতে অর্থাভাবের অভিযোগ যখন শোনা যাচ্ছে, তখন বিমান ও হেলিকপ্টার খাতে বিপুল ব্যয়ের হিসাব রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দলীয় অন্দরের একাংশের দাবি, অডিট রিপোর্টে উল্লেখিত সম্পদ, নগদ অর্থ এবং বর্তমান আর্থিক অবস্থার মধ্যে কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিরোধী ও বিদ্রোহী শিবিরের নেতারা এই হিসাবকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।