নিজস্ব প্রতিনিধি,হুগলী: জি আই তকমার পথে এগোচ্ছে বলাগড়-এর শতাব্দীপ্রাচীন নৌকা শিল্প। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জীবিকার এক অটুট বন্ধনে গড়ে ওঠা এই শিল্প একসময় ছিল বাংলার নদীনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। আজ সেই শিল্প অস্তিত্বের সংকটে দাঁড়িয়ে থাকলেও জিআই স্বীকৃতি নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে—তবে শিল্পীদের দাবি, শুধু স্বীকৃতি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সরকারি সহায়তা ও বাস্তব কর্মসংস্থানের পথ।
একদা সপ্তগ্রাম বাণিজ্যবন্দরকে কেন্দ্র করে হুগলি নদীপথে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ নৌ-বাণিজ্য। সেই সময় বাংলার মাঝি-মাল্লা ও নৌকারিগররা ছিলেন এই নদীসভ্যতার প্রধান চালিকাশক্তি। ধান, নুন, কাপড়, মশলা ও নানা পণ্যের আদান-প্রদান হতো কাঠের তৈরি ডিঙি, ভুটভুটি, বজরা ও মাঝারি আকারের পণ্যবাহী নৌকায়। এই শিল্প শুধু পেশা নয়, ছিল প্রজন্মান্তরে বহমান এক দক্ষতা—নৌকা তৈরির কাঠ বাছাই, নকশা, জলরোধী প্রলেপ ও ভারসাম্য রক্ষার কৌশল ছিল সম্পূর্ণ হাতে-কলমে শেখা বিদ্যা। কিন্তু সময় বদলেছে। রেল ও সড়ক যোগাযোগের বিস্তার, নদীপথে নাব্যতা হ্রাস, আধুনিক ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের ব্যবহার এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এই শিল্প। রাজনৈতিক পালাবদল হলেও বাস্তব পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। বহু কারিগর বাধ্য হয়েছেন অন্য পেশায় যেতে। কেউ হয়েছেন নির্মাণ শ্রমিক, কেউ পরিযায়ী শ্রমিক।
সম্প্রতি ডিঙি নৌকার জন্য জিআই তকমা পাওয়ার প্রক্রিয়া শিল্পীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এই স্বীকৃতির ফলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বলাগড়ের নৌকা আলাদা পরিচিতি পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যের ক্ষেত্রে জিআই তকমা অনেক সময় বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হয়। পর্যটন ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব বাড়তে পারে—নদীভ্রমণ, ঐতিহ্যবাহী নৌকা প্রদর্শনী কিংবা সংস্কৃতি-ভিত্তিক পর্যটন নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিতে পারে।তবে শিল্পীদের বক্তব্য, কেবল জিআই তকমা পেলেই তাদের পেটের ভাত জুটবে না। নৌকা তৈরির অর্ডার না বাড়লে কিংবা সরকারি প্রকল্পে তাদের যুক্ত না করা হলে বাস্তবে আয় বাড়বে না। তাঁরা চান, রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার নিয়মিত নৌকার বরাত দিক—পর্যটন, মৎস্য, নদী পরিবহণ কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলা সংক্রান্ত প্রকল্পে এই শিল্পীদের তৈরি নৌকা ব্যবহার করা হোক।
আধুনিক যুগেও নদীনির্ভর জীবনে মাঝি-মাল্লাদের গুরুত্ব কমেনি। আজও বহু গ্রাম নদীপথে যাতায়াত নির্ভর। বর্ষাকালে বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এই নৌকাগুলিই হয়ে ওঠে জীবনরক্ষাকারী বাহন। মাছধরা, নদী পারাপার, ছোটখাটো পণ্য পরিবহণ—সব ক্ষেত্রেই কাঠের তৈরি নৌকার প্রয়োজন রয়ে গেছে। ফলে এই শিল্প শুধু ঐতিহ্য নয়, বর্তমান বাস্তবতায়ও প্রয়োজনীয়।সম্প্রতি শিল্প নিগম ও নৌ শিল্প সমবায় সমিতির মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে নৌকা শিল্পকে ক্লাস্টার হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব উঠে এসেছে। ক্লাস্টার হলে একদিকে উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সরবরাহ ও বিপণনের সুবিধা পাওয়া যাবে। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রাচীন নকশার সমন্বয় ঘটিয়ে বাজারমুখী পণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নৌকা শিল্পকে বাঁচাতে হলে শুধু ঐতিহ্যের আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তব অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।সরকারি বরাত ও ভর্তুকি,পর্যটন ও নদীভ্রমণ প্রকল্পে স্থানীয় নৌকার ব্যবহার। বলাগড়ের নৌকা শিল্প আসলে বাংলার নদীসভ্যতার জীবন্ত দলিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে মাঝি-মাল্লারা নদীর সঙ্গে লড়াই করে জীবন ও জীবিকা গড়েছেন, তাঁদের দক্ষতা আজও অমূল্য সম্পদ। জিআই তকমা সেই ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দিলেও, তা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সুসংহত সরকারি নীতি ও বাজারমুখী উদ্যোগ। নচেৎ এই শিল্প কেবল ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।আজ প্রশ্ন একটাই—এই প্রাচীন শিল্পকে শুধু গর্বের নিদর্শন করে রাখা হবে, নাকি তাকে আবার জীবিকার ভরসা হিসেবে ফিরিয়ে আনা হবে?
