প্রীতম দাস, বীরভূম: শান্তিনিকেতনে কোপাই নদীর তীরবর্তী ও তার আশপাশের এলাকায় রয়েছে সারি সারি খেজুরের গাছ ৷ প্রতি বছর শীত পড়লেই শিউলিরা খেজুর ও তালপাতা দিয়ে ঘর তৈরি করেন ৷ খেজুর গাছগুলির মাথার দিকে ছাল ছাড়িয়ে বেঁধে দেওয়া হয় মাটির হাঁড়ি ৷ সারা রাত ও দিনভর ধরে টুপ টুপ করে রস জমতে থাকে হাঁড়িগুলিতে৷ দিনে দুই বার, ভোরে ও বিকেলে সেই রস সংগ্রহ করেন শিউলিরা৷ তারপর তা বড় বড় লোহার ট্রে-তে দীর্ঘক্ষণ ধরে ফুটিয়ে ঝোলা ও পাটালি গুড় তৈরি করা হয়৷ সারা বছরই ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ শান্তিনিকেতনে ভিড় বসান প্রচুর পর্যটক৷ তবে শীতের মরশুমে পর্যটকদের ঢল থাকে চোখে পড়ার মতো ৷ কোপাই নদীর তীরে গিয়ে ভোরবেলা ও বিকেলে খেজুর গাছের টাটকা রস পান করায় যেন আলাদা তৃপ্তি মেলে৷ শান্তিনিকেতনের গুড়ের চাহিদা বরাবরই থাকে তুঙ্গে ৷ এখান থেকে খেঁজুর গুড় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত তো বটেই, এমনকি পাড়ি দেয় ভিন রাজ্যেও।
কিন্তু, এবছর ১২ জানুয়ারি নিপা ভাইরাসে রাজ্যের দুই নার্সের আক্রান্ত হওয়ার খবর সামনে আসতেই চিত্রটা যেন সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে ৷ প্রথম দিকে আশঙ্কাজনক অবস্থা হলেও এখনও ওই দুই নার্স বেলেঘাটা আইডি-তে চিকিৎসাধীন । রাজ্যে নিপা সংক্রমণ ধরা পড়তেই চিকিৎসকরা সাবধান করছেন৷ কারণ এর আগেও কেরল, পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ইতিহাস আছে ৷
বিশেষত, বাদুড়ের লালা, মলমূত্র থেকে ছড়ায় নিপা ভাইরাস৷ যার সংক্রমণে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে৷ চিকিৎসকরা বাদুড়ের আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন খেজুর গাছে বাঁধা হাঁড়ি ৷ তাতে জমা রস পান করলে সংক্রমণের সম্ভাবনা প্রবল রয়েছে বলেই জানিয়েছেন তাঁরা ৷ তবে যে কোনও কাটা ফল খেতেও বারণ করেছেন চিকিৎসকরা ৷ তাই এবার মানুষজন বাড়তি সতর্ক ৷ যার জেরে কপাল পুড়েছে শিউলিদের ৷ ভরা শীতের মরশুমেও প্রাণভয়ে খেজুর রস ও গুড় থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন সাধারণ মানুষ ৷ তাতেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা ৷ শুধু রস নয়, খেজুর গুড়ও কিনতে চাইছেন না অনেকেই ৷ নিপা ভাইরাসের আতঙ্কে ভাটা পড়েছে খেজুর রস ও গুড়ের বিকিকিনিতে৷ বিক্রেতারা জানান, আগে যেখানে দিনে ১০০০ টাকার খেজুরের রস বিক্রি হত, সেখানে নিপা আতঙ্কে কমেছে বিক্রি।
যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, খেজুর রসকে ফুটিয়ে গুড় তৈরি হয় ৷ 100 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে 15 মিনিট বা 60 ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে 30 মিনিট ফোটানোর পর নিপা ভাইরাসের কোনও অস্তিত্ব থাকে না ৷ তাই খেজুর গুড় খাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা নেই । তবে খেজুর রস না-খাওয়াই ভালো ।
অপরদিকে এই বিষয়ে বিশ্বভারতীর পিয়ার্সন মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিকিৎসক মোহিত সাহা বলেন, “নিপা ভাইরাস মূলত বাদুড়ের লালা, মলমূত্র থেকেই ছড়ায় ৷ তা ছাড়াও শূকরের দেহ থেকেও ছড়ায় ৷ এই ভাইরাস মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দেহেই সংক্রমিত হয় ৷ তাই এই মুহূর্তে খেজুর রস না-খাওয়াই উচিত ৷ কিন্তু, খেজুর গুড়ে কোনও সমস্যা নেই ৷ সাবধানতা অবলম্বন করুন কিন্তু, আতঙ্কিত হবেন না ।”
