অর্পিতা মুখার্জী, কলকাতা: কিশোরীকে চুম্বন করার অভিযোগে তরুণ প্রেমিক, তাঁর বাবা ও আরেক বন্ধুকে ‘শাস্তি’ দিয়েছিল কিশোরীর পরিবার। খাস কলকাতায় ওই তিন জন পুরুষকে নগ্ন করে হাঁটানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। পরে তরুনের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয় কিশোরীর বাবা, মা, মামা ও এক প্রতিবেশীকে। এবার সেই ঘটনায় নয়া বিতর্কের সূত্রপাত। বেহালার সরশুনার ওই ঘটনায় ধৃত তিন অভিযুক্তকে খালি গায়ে, খালি পায়ে হাঁটাল পুলিশ।
পুলিশের দাবি, ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্যই এভাবে হাঁটানো হয়েছে। কিন্তু পুলিশ এই কাজ করতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার সংগঠন ও বিরোধীরা। নগ্ন করে হাঁটানোর পাল্টা শাস্তি হিসেবেই অভিযুক্তদের অর্ধনগ্ন করে ঘোরানো হল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগ, ১৩ বছরের এক কিশোরীকে চুম্বন করার অভিযোগে ১৯ বছরের এক তরুণ, তাঁর বাবা ও তাঁর বন্ধুকে শাস্তি দিতে প্রকাশ্য রাস্তায় প্রায় ৫০ মিটার নগ্ন অবস্থায় হাঁটতে বাধ্য করা হয়। তরুণের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে সোমবার সরশুনা থানায় মামলা হয়। গ্রেফতার করা হয় কিশোরীর বাবা প্রদীপ সরকার, মামা রাহুল বর্মন, মা রিঙ্কু সরকার ও প্রতিবেশী শঙ্কর সাউকে। বাকিদের খোঁজ চলছে।
মঙ্গলবার সকালে সরশুনা এলাকাতেই ধৃত তিন জনকে খালি গায়ে, খালি পায়ে হাঁটানো হয়। তিন জনের কোমরে দড়ি বাঁধা ছিল, পরনে হাফ প্যান্ট বা বারমুডা। সঙ্গে ছিলেন পুলিশকর্মীরা। ঘটনা দেখতে ভিড় জমান স্থানীয়রা। পুলিশ সূত্রে খবর, এঁদের মধ্যে রয়েছেন কিশোরীর বাবা, মামা ও ধৃত প্রতিবেশী।
এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে এপিডিআর। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ আহমেদ বলেন, “যে ঘটনা ঘটেছে, তা লজ্জাজনক। দীর্ঘক্ষণ ধরে ওই তরুণ ও তাঁর বাবার সঙ্গে ঘটনা ঘটল, অথচ পুলিশ সময়মতো পৌঁছল না। পাল্টা পুলিশ কী করল? অভিযুক্তদের অর্ধনগ্ন করে প্যারেড করাল! এই ট্রেন্ড নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেখছি।” তাঁর প্রশ্ন, “পুলিশের কর্মবিধিতে বা ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় এটা কোথায় আছে? পুলিশের কাজ আইন রক্ষা করা, নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া নয়। ইতিহাস সাক্ষী, এভাবে অপরাধ কমে না।” দু’টি ঘটনাকেই ‘সভ্যতার কলঙ্ক’ বলে মন্তব্য করেছেন মমতা তৃণমূলের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, “পুলিশ খালি গায়ে, খালি পায়ে হাঁটালেই কি অপরাধের শাস্তি হয়ে যাবে?”
প্রসঙ্গত, এটাই প্রথম নয়। রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিভিন্ন মামলায় ধৃত তৃণমূল নেতাদেরও কোমরে দড়ি বেঁধে, খালি পায়ে ঘোরানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবারই পুলিশের তরফে পুনর্নির্মাণের যুক্তি দেওয়া হয়।
গত জুনে একটি জনস্বার্থ মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ ছিল, পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারে, আইন মেনে ব্যবস্থা নিতে পারে, দোষ প্রমাণ হলে ফাঁসিও হতে পারে, কিন্তু গ্রেফতারের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে সম্মানহানি করতে পারে না। বিচারপতি জয় সেনগুপ্ত ও বিচারপতি স্মিতা দাস দে-র বেঞ্চ রাজ্যের কাছে রিপোর্টও তলব করেছিল।