ওঙ্কার ডেস্ক: বিজ্ঞান কি তাহলে সেই দিকেই এগোচ্ছে, যেখানে ভবিষ্যতে সন্তানজন্মের জন্য পুরুষ প্রয়োজনই থাকবে না? এমন প্রশ্ন উঠছে, কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা এখন সফলভাবে কৃত্রিম শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরির পথে এগোচ্ছেন। এমনকি ইঁদুরের উপর পরীক্ষাও সফল হয়েছে। কৃত্রিম শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে জন্ম নিয়েছে সুস্থ ইঁদুর ছানাও।
জাপান, চিন ও আমেরিকার বিজ্ঞানীরা ‘ইন ভিট্রো গ্যামেটোজেনেসিস’ নামক এক অত্যাধুনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কৃত্রিম জনন কোষ তৈরি করতে কোমর বেঁধে নেমেছেন। এর উদ্দেশ্য একটাই সন্তানহীন দম্পতির মুখে হাসি ফোটানো। যাঁরা প্রাকৃতিক ভাবে সন্তান ধারণে অক্ষম, যাঁরা ক্যানসারের মতো রোগে বা চিকিৎসায় জননক্ষমতা হারিয়েছেন, এমনকি সমলিঙ্গের জুটি সকলের জন্যই এই পদ্ধতি হতে পারে আশার আলো।
কিন্তু কীভাবে তৈরি হচ্ছে এই কৃত্রিম শুক্রাণু? তার মূল চাবিকাঠি হল স্টেম কোষ বা মাতৃকোষ। চিনের বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই ইঁদুরের শরীরের স্টেম কোষ থেকে সফল ভাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করে ফেলেছেন। এই স্টেম কোষ থেকেই শরীরের নানা ধরনের কোষ তৈরি করা যায়। প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষ হল এমন এক কোষ, যাকে নির্দিষ্ট রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রাইমরডিয়াল জার্ম সেলে রূপান্তর করা যায়। এই জার্ম সেল থেকেই তৈরি হয় শুক্রাণু ও ডিম্বাণু। প্লুরিপোটেন্ট স্টেম কোষ পাওয়া যায় দুটি উপায়ে। এক, ভ্রূণের কোষ থেকে, যাকে বলে এমব্রায়োনিক স্টেম সেল; এবং দুই, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরের কোষ থেকে, যেগুলিকে বলা হয় ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট সেল। এই কোষগুলিকে নিয়ে গবেষণাগারে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে বলেই দাবি গবেষকদের। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা এই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা চালাচ্ছেন।
এই গবেষণার পিছনে শুধু বিজ্ঞান নয়, রয়েছে নৈতিক ও সামাজিক দিক নিয়েও তীব্র বিতর্ক। কৃত্রিম জনন কোষ থেকে তৈরি সন্তান কি আদৌ নিরাপদ হবে? জিনগত হেরফের হলে তার পরিণতি কী হতে পারে? এ সব প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীমহল ও সমাজের একাংশ দ্বিধাবিভক্ত। তবে গবেষকেরা বলছেন, এই পদ্ধতি সফল হলে শুধুই সন্তানহীনতা নয়, জিনগত রোগও অনেকটাই প্রতিরোধ করা যাবে। শিশুর জন্মের আগে জিনগত ত্রুটি মেরামত করে নেওয়া সম্ভব হবে। এমনকি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত নারী বা পুরুষ, যাঁরা প্রজননক্ষমতা হারিয়েছেন, তাঁরাও হয়ে উঠতে পারেন সন্তানের জন্মদাতা। এই প্রক্রিয়া সেই সমস্ত ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে, যেখানে আইভিএফ পদ্ধতি ব্যর্থ হয়েছে। বয়সজনিত কারণে সন্তান ধারণে সমস্যা হলে বা দীর্ঘ চিকিৎসার কারণে প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলে এই নতুন পদ্ধতি হয়ে উঠতে পারে বিকল্প আশ্রয়।
যদিও এই গবেষণা এখনও পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে এবং মানুষের উপর প্রয়োগের আগে বহু ধাপ পেরোতে হবে, তবু বিজ্ঞানীদের দাবি, ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সন্তানজন্মের ধারণা বদলে যাবে। তখন প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রকৃতির ভূমিকা কতটা থাকবে এই প্রক্রিয়ায়, আর কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকবে মানুষের হাতে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ভবিষ্যতের গবেষণাই বলে দেবে।
