
নয়ন বিশ্বাস রকি
বাঙালির রক্তে মিশে আছে সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখ, উদীচীর গান, ছায়ানটের সুর, নাটকের মঞ্চ, যাত্রাপালা – এগুলো শুধু বিনোদন না: এগুলো ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যে জাতির সংস্কৃতি নেই, সে জাতির আত্মপরিচয়ও নেই।
কিন্তু গত দুই বছরে আমরা দেখছি বারবার এই সংস্কৃতির উপর আঘাত আসছে। সাম্প্রতিকতম ঘটনা গাইবান্ধা পুলিশ লাইনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা। অভিযোগ উঠেছে উগ্রপন্থী জঙ্গিবাদী সন্ত্রাসীরা অনুষ্ঠান ভেঙে দিয়েছে এবং পুলিশ সদস্যরা আহত হয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে – যে দেশের পুলিশ লাইনই নিরাপদ নয়, সে দেশের সাধারণ মানুষ কিভাবে নিরাপদ থাকবে ?
এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ২০০৪ সালের ২০ আগস্ট উদীচীর শিল্পী গোষ্ঠীর উপর বোমা হামলা হয়েছিল। ২০১৬ সালে টাঙ্গাইলে যাত্রাপালা বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ছায়ানট, উদীচী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রোগ্রামে বাধা দেওয়ার খবর আমরা প্রায়ই শুনি।
ইতিহাস বলছে সংস্কৃতিই আমাদের পরিচয়
১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার যখন “রাষ্ট্রভাষা উর্দু” চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, তখন বাঙালি প্রথম প্রতিরোধ করেছিল গান আর কবিতা দিয়ে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা। “একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়ে” – এই গান শুনে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিল হাজারো যুবক।
সংস্কৃতি মানে শুধু নাচ-গান না। সংস্কৃতি মানে সহনশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তচিন্তা। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৪টি মূলনীতির একটি ছিল “ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ”। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমরা বাঙালি, আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে।”
কারা এই আঘাত করছে ?
গত দুই বছরের বিভিন্ন রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় দেশে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। উদীচী, ছায়ানট, নাট্যদলগুলোর উপর হামলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করার “পাঁয়তারা” – এগুলো নিছক কাকতালীয় নয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পর থেকে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা না হওয়ায় উগ্রপন্থীদের “লাফালাফি” বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই শুধু কালের কণ্ঠের রিপোর্ট অনুযায়ী বিএনপি-জামায়াতের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ২৩ জন নিহত এবং ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন। এই অস্থিরতার সুযোগে মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিচ্ছে।
ইসলাম এবং উগ্রবাদের পার্থক্য
এখানে একটা কথা স্পষ্ট করা দরকার। ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭১ সালে যারা “স্বাধীনতার বিরোধিতা” করেছিল, সেই রাজাকার-আলবদর-আলশামস গোষ্ঠীই আজকের উগ্রপন্থার বীজ বুনেছিল। তারাই মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছিল, তারাই এখন সংস্কৃতি হত্যা করছে।
পবিত্র ইসলামের সবচেয়ে বড় ক্ষতি তারাই করেছে যারা ধর্মের নামে সহিংসতাকে জায়েজ করে। নবী করিম (সা.) এর সময়ও মদিনায় বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতো। সেখানে সংস্কৃতি চর্চায় বাধা ছিল না।
জাতির কাছে প্রশ্ন
- বিএনপি সরকারের কাছে দেশের জনগণ জানতে চায় – দেশে কি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এখন বন্ধ হয়ে যাবে?
- প্রতিটি সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামের অনুমতি কি এখন মৌলবাদীদের কাছ থেকে নিতে হবে ?
- গাইবান্ধার মতো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত কেন হচ্ছে না ?
যে দেশ ১৯৫২-তে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে, ১৯৭১-এ ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এনেছে, সে দেশে সংস্কৃতি বন্ধ হবে এটা মেনে নেওয়া যায় না।
উপসংহার: প্রতিরোধের পথ
সংস্কৃতি ছাড়া একটি জাতি বাঁচে না। পাকিস্তানিরা ১৯৭১-এ এটাই বুঝতে পারেনি। তাই তারা রবীন্দ্রনাথের বই পুড়িয়েছিল, বুদ্ধিজীবী মেরেছিল। আজও যারা সংস্কৃতির উপর আঘাত করে তারা সেই একই পথের পথিক। তাই প্রতিটি হামলার দ্রুত বিচার এবং দোষীদের শাস্তি, স্কুল-কলেজে সাংস্কৃতিক চর্চা বাধ্যতামূলক, রাষ্ট্রীয়ভাবে সংস্কৃতি সুরক্ষা আইন করা উচিত। বাঙালি ১৯৫২ তে মাথা নোয়ায়নি, ১৯৭১ এ মাথা নোয়ায়নি। ২০২৬ এ এসেও মাথা নোয়াবে না। কারণ আমাদের রক্তে মিশে আছে “আমার সোনার বাংলা”। সংস্কৃতি বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। সংস্কৃতি মরলে বাংলাদেশ মরবে। সিদ্ধান্ত নিতেই হবে।