মৌসুমী পাল
চলতি মাসে বাংলাদেশে অবশেষে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে জাতীয় নির্বাচন। ভোটগ্রহণের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। পোস্টার, মিছিল, জনসভা, প্রচারগাড়ির দাপট চলছে ঢাকা খুলনা, চট্টগ্রামে। কিন্তু এই প্রচারের আবরণের আড়ালে রয়েছে দেশের অভ্যন্তরে চলমান এক অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা এবং ভয়। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা কিছুটা হলেও প্রশ্নের মুখে। বাংলাদেশের জন্ম, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল বাঙালিত্বের চেতনা, ধর্মীয় বিভাজন নয়। কিন্তু বর্তমানে রাজনীতির বাস্তবতা অনেকটাই বদলেছে। ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে রেখে রাজনীতির মেরুকরণ বেড়েছে, আর তার সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে সংখ্যালঘুদের ওপর।
২০২৪ সালে জুলাই মাসে গণঅভ্যুথানের সময় রাজনৈতিক চাপের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লিগের নেত্রী তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাসিনা বাংলাদেশ থেকে পালানোর পর দেশের শাসনভার তুলে দেওয়া হয় ইউনুস পরিচালিত দেশের অন্তরবর্তী সরকারের উপর। এই সরকারের উপর দায়িত্ব ছিল দেশের অশান্তি দূর করে একটি নির্বাচিত সরকার উপহার দেওয়া। কিন্তু ইউনূস ক্ষমতায় এসেই লক্ষ্যের গতিমুখ বদলে দেন। উঠে আসে কুর্শি বাঁচানোর নানান কৌশল। অবশেষে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলির চাপে, বিশেষ করে যে সংগ্রামী ছাত্রদের সমর্থনে ইউনূস ক্ষমতায় এসেছিলেন তাঁদের চাপে বহু টালবাহনার পর নির্বাচনের দিন ঘোষণা করে ইউনুস সরকার। চলতি মাসের ১২ তারিখে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়েছে। আর সেই নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।
হিন্দু সম্প্রদায়, যারা বাংলাদেশের বৃহত্তম সংখ্যালঘু, তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি নতুন নয়। দেশে নির্বাচন বা অভ্যন্তরীণ অশান্তির পরিস্থিতি তৈরি হলে এই আশঙ্কা বহুগুন বেড়ে যায়। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ভোটের আগে-পরে বহু জায়গায় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, মন্দির, দোকানপাটে হামলার ঘটনা ঘটেছে। রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা ভোটের অঙ্ক মেলাতে তাদের সহজ লক্ষ্যবস্তু করে তোলা হয়েছে। ফলে অনেক পরিবার ভোটের দিন বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় গা ঢাকা দিতে বাধ্য হয়। আবার কেউ কেউ আবার প্রকাশ্যে মতামত জানাতেই ভয় পায়। এই বাস্তবতা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। কারণ, যে ভোট ভয়ের মধ্যে দিতে হয়, তা প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রের পরিপন্থী।
বর্তমানে বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে নির্বাচন প্রক্রিয়া কতটা সুষ্ট ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়। নিত্যদিন পদ্মাপার থেকে অশান্তি, সাম্প্রদায়িক ঝামেলা থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার মৃত্যুদন্ড কে ঘীরে উতপ্তের ঘটনা সামনে আসছে। বিশেষ করে সেদেশে থাকা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হয়ে চলা ধারাবাহিক আঘাত শুধুমাত্র সেদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এবিষয়ে সরব হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলও।
দেশের রাজনীতি কী ক্রমশ ইসলাম-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে ? এই প্রশ্ন বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে বারংবার উঠে আসছে। দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও, মাটির রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করার প্রবণতা স্পষ্ট। প্রচারে ধর্মীয় ভাষ্য, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় সংগঠনের সঙ্গে বোঝাপড়া, ধর্মীয় পরিচয়কে হাতিয়ার করে ভোটব্যাঙ্ক তৈরি এসবই স্বাভাবিক চিত্র পদ্মাপারে। বিশেষ করে আওয়ামী লিগের সময়কালে নিষিদ্ধ জামাতকে ফের ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনে সক্রীয় করেছে ইউনুস সরকার। বংলাদেশে চরম ইসলামপন্থী দলগুলোর পুনরুত্থান রাজনৈতিক অঙ্ককে জটিল করে তুলেছে। এক সময় প্রান্তিক থাকা এই শক্তিগুলো এখন আবার জোট-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা সরাসরি রাষ্ট্রকে ইসলামি কাঠামোর দিকে ঠেলে দিতে চায় কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তাদের প্রভাব যে বাড়ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এই প্রভাব যত বাড়বে, সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগও তত বাড়বে।
আর এখানে পাকিস্তানের প্রসঙ্গও উঠে আসে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে। তাই পাকিস্তানের প্রভাবের আশঙ্কা মানসিক ও ঐতিহাসিকভাবে খুব সংবেদনশীল বিষয়। বাস্তবে সরাসরি হস্তক্ষেপের স্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও, রাজনৈতিক শক্তিগুলির আদর্শগত মিল বা পাকিস্তানপন্থী বক্তব্য মানুষকে সন্দিহান করে তোলে। বিশেষত যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া দলগুলো রাজনৈতিক মূলস্রোতে জায়গা করে নেয়, তখন সেই আশঙ্কা আরও তীব্র হয়।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ। এই উদ্বেগ একদিনে বা একটি ঘটনায় আসেনি। বাংলাদেশে সামান্য ঝামেলার আঁচ গিয়ে পরেছে সংখ্যালঘুদের উপর। তাদের বাড়িঘর ভেঙ্গে ফেলা, মন্দিরে আঘাত, হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তির ভাঙ্গা থেকে শুরু করে এখন তো সরাসরি তাদের উপর হামলার ঘটনাও সামনে আসায় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা বাড়ে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের জুলাই গনঅভুত্থানের সময় অন্যতম জনপ্রিয় মুখ তথা রাজনৈতিক দল ইনক্লাব মঞ্চের সুপ্রিমো ওসমান হাদির মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে ময়মনসিংহের এক সংখ্যালঘু দিন মজুর দিপুচন্দ্র দাসের মৃত্যুতে সাড়া পরে গিয়েছিল দেশ-বিদেশ জুড়ে। মৃত দিপু দাস ইসলাম ধর্মকে অবমাননা করে মন্তব্য করেছে বলে উত্যক্ত জনতার সামনে পেশ করে তারই সহকর্মীরা। মারমুখী জনতা দিপু দাসকে পিটিয়ে মেরে ফেলেও শান্তি হয়নি, তারপর তার দেহকে রাস্তার মাঝে গাছে ঝুলিয়ে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দিপুচন্দ্র দাসের উপর আনা আরোপের কোনো প্রমাণ পায়নি পুলিশ। এই ঘটনার পর বাংলাদেশে অবস্থানরত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে যায়।
শুধুমাত্র দিপুচন্দ্র দাসের মৃত্যু নয়, হাসিনার দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর প্রায় দের বছর ধরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু দের উপর আক্রমণের হার বহুগুন বেড়েছে। শরীয়তপুরে খোকন দাস নামের এক ব্যক্তিকে প্রথমে কুপিয়ে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। চলতি বছরের শুরুতেই নওগাঁ এলেকায় মিঠুন সরকার নামের এক ব্যক্তির উপর চুরির অভিযোগ আনা হয়। মারমুখী জনতা তার দিকে ধেয়ে এলে প্রাণভয়ে জলে ঝাপ দিলেও প্রান রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। প্রায় একই সময়কালে গাজীপুরে লিটনচন্দ্র দাসকেও চো্র অপবাদে পিটিতে মেরে ফেলা হয়।
আদতে এই ঘটনা গুলি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর হওয়া অত্যাচারের হিমশৈলের মাথা মাত্র। আসন্ন নির্বাচন ও তার ফলাফল তাদের হিতে কতটা যাবে সেনিয়ে সংশয় থেকেই যায়। যদি রাজনৈতিক দলগুলো সত্যিই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়, তবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও আস্থা ফেরানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু আশ্বাস নয়, আইনের কঠোর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
