মৌসুমী পাল
বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল ভাষা, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সেই রাষ্ট্রগঠনের মূল ভিত্তিই ছিল জনগণের ভোটাধিকার ও প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও নির্বাচনী রাজনীতি নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন মুছে যায়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক, বয়কট, সহিংসতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট আরও প্রকট হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত অধ্যায়গুলির একটি হয়ে দাঁড়ায়। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজ এই নির্বাচনকে ‘ডামি নির্বাচন’ বা ‘প্রহসনের ভোট’ বলে অভিহিত করেছেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ছিল অস্বাভাবিক। দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি-সহ অধিকাংশ বিরোধী শক্তি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ভোটের দাবি জানায়। তাদের অভিযোগ ছিল, তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এই দাবিকে কেন্দ্র করে টানা আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ এবং দফায় দফায় সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পদ্মাপার। শেষপর্যন্ত বিরোধীরা নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলত ভোটের লড়াই হয়ে দাঁড়ায় একতরফা।
নির্বাচনের দিন বহু কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম। কোথাও কোথাও ভোটারবিহীন বুথের ছবি ভাইরাল হয় সমাজমাধ্যমে। অনেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল শুধুই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বনাম স্বতন্ত্র বা তথাকথিত ‘ডামি’ প্রার্থী, যাঁদের অনেকে আওয়ামী লিগের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত। ফলাফল ঘোষণার পর দেখা যায়, আওয়ামি লিগ এবং তাদের মিত্ররা প্রায় ৯৪ শতাংশ আসনে জয়ী। বিরোধী কণ্ঠস্বর কার্যত সংসদে অনুপস্থিত ছিল। গণতন্ত্রে যেখানে শক্তিশালী বিরোধী দলের উপস্থিতি ভারসাম্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য, সেখানে এমন ফল স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল নির্বাচন প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও। ‘ডামি নির্বাচন’ তকমা পাওয়ার মূল কারণও এখানেই। নির্বাচন ছিল, কিন্তু প্রকৃত প্রতিযোগিতা ছিল না। নির্বাচনের ফলাফল জনগণের স্বাধীন মতামতের প্রতিফলন কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই গিয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ভোটের লড়াইয়ের বদলে সেটি হয়ে উঠেছিল কেবল লোক দেখানেও আনুষ্ঠানিকতা।
এই পরিস্থিতির রাজনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। একতরফা জয় ক্ষমতাসীনদের জন্য স্বল্পমেয়াদে সুবিধাজনক হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা অস্থিরতা ডেকে আনে। বিরোধী শক্তিকে রাজনীতির মূলধারা থেকে সরিয়ে দিলে ক্ষোভ জমতে থাকে রাস্তায়, সামাজিক মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও। প্রশাসন ও সরকারের ওপর মানুষের আস্থা কমে যায়।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ২০২৪-পরবর্তী সময়ে দেশে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্র-যুব প্রতিবাদ এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি ক্ষোভ বাড়তে থাকে, তার মূলে ছিল এই নির্বাচন। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকালে উন্নয়নমূলক কাজের পাশাপাশি কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার অভিযোগও জমা হচ্ছিল। দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের নেওয়া সাংবিধানিক পদক্ষেপে যুব সমাজ ক্ষীপ্ত হয়ে ওঠে। পাশাপাশি নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই সেই অসন্তোষ আরও তীব্র হয়। আন্তর্জাতিক মহলেও চাপ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সংকট এমন জায়গায় পৌঁছয়, যেখানে সরকারের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এর ফলস্বরুপ হাসিনার শপথ গ্রহনের মাত্র সাত মাসের মধ্যে পতন হয় হাসিনার। দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় সেখ হাসিনা সহ আওয়ামী লিগের একাধিক শীর্ষনেতা।
আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে তাই নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলির সামনে বড় শিক্ষা রয়েছে। প্রথমত, সকল দলের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে দেশের অন্তরবর্তী সরকারকে। বিরোধীদের দমন নয়, আলোচনার মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন দেশে। দ্বিতীয়ত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ রাখতে হবে, যাতে ভোটাররা ভয়মুক্তভাবে ভোট দিতে পারেন। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা বাড়ানো গেলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে বড় কথা, ভোটারদের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা জরুরি। মানুষ যদি মনে করে ভোটের কোনও মূল্য নেই, তবে গণতন্ত্রের অস্তিত্বই সংকটে পড়ে। ২০২৪ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা জরুরী। অন্যথায় একই চক্র আবারও অস্থিরতার জন্ম দেবে পদ্মাপারে।
