শুভম কর্মকার, বাঁকুড়া : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ণমুখী বাংলায় খাবারের অভাবে মৃত্যু হল এক বৃদ্ধর। বাঁকুড়া শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বাঁকুড়া ১ নম্বর ব্লকের অন্তর্গত কুমিদ্যা গ্রামে এমন ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গিয়েছে। বৃদ্ধার প্রতিবেশীদের অভিযোগ, উন্নয়নের যুগে দাঁড়িয়েও অর্ধাহারে মরতে হল বৃদ্ধকে। যদিও মৃত্যুর এই কারণ মানতে নারাজ ব্লক প্রশাসন।
কুমিদ্যা গ্রামে বসবাস করতেন বৈদ্যনাথ দাস মোদক নামে বছর সত্তরের দ্বোর গোড়ার এক প্রৌঢ় এবং তার স্ত্রী। ছেলে কর্মসূত্রে পরিযায়ী শ্রমিক হওয়ায় বাড়ির বাইরে বসবাস করতেন। সম্বল বলতে ছিল তার দুই চালা জরাজীর্ণ বাড়ি। গত তিনদিন আগে ওই বৃদ্ধ বৈদনাথ দাস মোদকের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর কারণ হিসেবে বারংবার শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি অর্ধাহারে তথ্য উঠে আসছে। মৃত্যুর আসল কারণ জানতে চাওয়া হলে গ্রামবাসীরাও অনাহারের তত্ত্বকেই বারংবার খাঁড়া করেছেন সংবাদমাধ্যমের কাছে। কিন্তু উন্নয়নের এই স্তরে দাঁড়িয়েও অনাহারে মৃত্যু ? শুনতে কেমন কেমন লাগলেও এটাই বাস্তব বলে দাবি প্রতিবেশীদের। এমন ঘটনায় ফের জেগে উঠছে আমলাশোলের স্মৃতি।
আমলাশোল ছিল আদতে একটি অতীব দুর্গম এলাকা। রাস্তাঘাট প্রায় ছিল না বললেই চলে! আর এই দুর্গমতার জন্যেই প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের খুব একটা নজরে আসতো না আমলাশোল এলাকার জীবন যন্ত্রণার করুণ কাহিনী। তারওপর জেলা পরিষদ বামেদের হাতে থাকলেও গ্রাম-পঞ্চায়েত ছিল নরেন হাঁসদার ঝাড়খণ্ড পার্টির, ফলে বামেদের তরফেও সেভাবে পঞ্চায়েত স্তরে সক্রিয় হওয়ার এবং হস্তক্ষেপ করবার সুযোগও ছিল না। কেউ কেউ অবশ্য বৈমাতৃসুলভ আচরণেরও অভিযোগ তুলেছিলেন কিন্তু সেই আমলাশোলকেই যাবতীয় দুর্গম পথ লঙ্ঘন করেই রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে তৎকালীন সংবাদমাধ্যম। একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতার এক অভিশপ্ত কাহিনী- অনাহারে মৃত্যু। যা টলিয়ে দিয়েছিল বাম আমলের প্রচারিত জনদরদী ভাবমূর্তিকে।
বর্তমানে সরকারের তরফ থেকে প্রত্যেকটি মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ স্বচ্ছ পরিমাণে থাকলেও। এক্ষেত্রে কেন উলট পুরান ? গ্রামবাসীদের দাবি, এক বছর আগে রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার কার্ডের বায়োমেট্রিক সংযোগ স্থাপনের নির্দেশিকা জারি হয়েছে। রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্য সরবরাহ পাওয়ার জন্য বায়োমেট্রিক বাধ্যতামূলক? বৈদ্যনাথ বাবু এবং তার পরিবারের রেশন কার্ড থাকলেও ছিল না কোনো আধার কার্ড। তাই দীর্ঘ এক বছর যাবৎ রেশন সামগ্রী তারা পায়নি বলেই জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা। বৈদ্যনাথ বাবুর স্ত্রী এবং তার পুত্রের দাবি তারা আধার কার্ডের জন্য নাকি আবেদন করেছিলেন। শেষমেষ হয়নি দেখে তারা সেই আশা ছেড়েও দিয়েছিলেন। অতঃপর তার পুত্র সন্তান বাইরে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করতে চলে যাওয়ায় নিয়মিত খাবার যুক্ত না প্রৌঢ় বৈদ্যনাথ বাবু এবং তার স্ত্রীর। ছেলে মাঝে মাঝে বাড়ি আসলে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হতো বলে জানা গেছে। প্রতিবেশীরা এবং গ্রাম সুরক্ষা কমিটি মাঝখানে কিছু খাবারের যোগান দিলেও তাদের পক্ষে দিনের পর দিন খাবার যোগানো সম্ভব হয়ে উঠছিল না বলেই জানিয়েছেন তারা। দুই চালা বাড়ির স্যাঁতস্যাঁতে মেঝে সেখানে জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখা গেল বৈদ্যনাথবাবুর স্ত্রী কল্পনা দেবীকে। তিনিও অনাহারে রয়েছেন বলে দাবি প্রতিবেশীদের।
ভারতবর্ষের নাগরিক, স্থায়ী বাসিন্দা হলেও আধার কার্ডের কোন ব্যবস্থা করা হয়নি কেন এই পরিবারের জন্য ? দায় কার উঠেছে প্রশ্ন ? ওই গ্রাম স্তরের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান একাধিকবার তাদেরকে আধার কার্ড করানোর জন্য তারা অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু পরিবারের গাছাড়া ভাবের জন্যই তাহলে ওঠেনি।
এই বিষয়ে স্থানীয় ব্লক প্রশাসনের তরফ থেকে বাঁকুড়া এক নম্বর পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি অংশুমান ব্যানার্জি জানান, “তাদের রেশন কার্ড ছিল, তারা একসময় রেশন সামগ্রীও পেতেন কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার সংযুক্তিকরণ এবং বায়োমেট্রিকের গেরোই তাদের আধার কার্ড না থাকাই রেশন সামগ্রী বন্ধ ছিল। ব্লক প্রশাসনের তরফ থেকে একাধিকবার তাদের আধার কার্ড করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলেও তারা এ ব্যাপারে কোনো সাড়া দেননি, তাই অনাহারে মৃত্যুর তত্ত্বকে খারিজ করেছেন তিনি।
বাঁকুড়ার বিজেপি বিধায়ক নীলাদ্রি শেখর দানা জানান, “একটা পুকুরকাটার বিষয় হলে ব্লক থেকে শুরু করে পঞ্চায়েতের মেম্বাররা সব ছুটে যাবে কাটমানির লোভে, কিন্তু মানুষের আসল বিপদে কাউকে পাওয়া যাবে না এই সরকারের এটাই নিয়ম”।
