ওঙ্কার ডেস্ক: ৯ জুলাই, দেশজুড়ে এক সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে, রাজ্যে যার প্রভাব ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রান্তে দেখা দিতে শুরু করেছে। ১০ টি কেন্দ্রীয় শ্রমিক সংগঠন ও তাদের সহযোগী ইউনিয়নগুলির ফোরাম এই ধর্মঘটের আহ্বান জানিয়েছে। প্রায় ২৫ কোটিরও বেশি শ্রমিক কর্মী এই ধর্মঘটে সামিল হবেন বলে শ্রমিক সংগঠনগুলির তরফে দাবি করা হয়েছে। ব্যাঙ্ক, বিমা, ডাক, রেল, মেট্রো থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি পরিষেবা খাতের কর্মীরাও এই ধর্মঘটে অংশ নিচ্ছেন। শ্রমিক সংগঠনগুলির অভিযোগ, সরকারের শ্রমিক-বিরোধী, কৃষক-বিরোধী ও কর্পোরেটপন্থী নীতির বিরুদ্ধে এই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে। অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের অমরজিৎ কৌর জানিয়েছেন, এই ধর্মঘটে দেশের গ্রামীণ শ্রমিক-কর্মীরাও সামিল হবেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, গত বছর শ্রমমন্ত্রী মনসুখ মান্ডব্যের কাছে ১৭ দফা দাবির সনদ জমা দেওয়া হলেও এখনও তা পূরণের কোনও আশ্বাস মেলেনি বলেই অভিযোগ।
রাজ্যের বিভিন্ন অংশে এই ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই আন্দোলন শুরু হয়েছে। কলকাতা মেট্রোর শ্রমিক সংগঠন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রাতের ডিউটি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, কর্মীদের স্বাস্থ্যের কথা না ভেবেই রাতের শিফটে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। ধর্মঘটের সমর্থনে কলকাতার এন্টালি মার্কেট থেকে কেন্দ্রীয় মিছিল বের হচ্ছে বুধবার। এছাড়াও যাদবপুর, শিয়ালদহ, খিদিরপুরে মিছিলের আয়োজন হয়েছে। হুগলি স্টেশনে রেল অবরোধ করে ধর্মঘট সমর্থকেরা হাওড়াগামী ডাউন ব্যান্ডেল লোকাল ট্রেন আটকে দেন। কিছুক্ষণ রেল চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পুলিশ এসে অবরোধ সরিয়ে দেয়।
হুগলির জুটমিল এলাকায় বন্ধের প্রভাব স্পষ্ট। ভদ্রেশ্বরের শ্যামনগর নর্থ জুটমিল ও বাঁশবেড়িয়া গ্যাঞ্জেস জুটমিলে সকাল থেকেই পিকেটিং শুরু হয়েছে। জেলার অন্য জুটমিলগুলিতেও শ্রমিকদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। ডোমজুড়ে বন্ধ সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় বচসা হয়েছে। লরি ও বাস আটকানোর চেষ্টায় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
দক্ষিণ কলকাতার শিয়ালদহ মেন শাখা, যাদবপুর স্টেশন, বেলঘরিয়া ও দুর্গাপুর রেলস্টেশনে ট্রেন আটকানোর চেষ্টা করেন বন্ধ সমর্থকেরা। শিয়ালদহের দক্ষিণ শাখার ট্রেন চলাচলও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। যাদবপুর, লেকটাউন, গাঙ্গুলিবাগান এলাকায় রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করা হয়। যাদবপুরে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। লেকটাউন ও গাঙ্গুলিবাগানেও মিছিল বার হয়েছে।
কোচবিহারের বিভিন্ন বাজার ও দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। বেসরকারি বাস চলাচল প্রায় অচল হলেও উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ সংস্থার বাস রাস্তায় দেখা গিয়েছে। তবে চালকদের হেলমেট পরে বাস চালাতে দেখা যায়, যা বিক্ষোভের উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে স্পষ্ট করে তোলে। দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট শহরে সকাল থেকেই বামপন্থী কর্মী সমর্থকেরা পথ অবরোধে নেমেছেন। সরকারি বাসস্ট্যান্ডের সামনে ও বালুরঘাট-মালদহ রাজ্য সড়ক অবরোধে দূরপাল্লার বাস আটকে পড়েছে। মুর্শিদাবাদের লালগোলায়ও ট্রেন অবরোধ করেছেন বন্ধ সমর্থকেরা।
অন্যদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ধর্মঘট রুখতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বনধকে ঘিরে নবান্ন থেকে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে রাজ্য সরকারি কর্মীদের উদ্দেশে। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, কোনওভাবেই ধর্মঘটে সামিল হওয়া বরদাস্ত করা হবে না। অসুস্থতা, বাড়িতে শোকের ঘটনা বা মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং হাসপাতালে ভর্তি থাকা এই কয়েকটি কারণ ছাড়া যদি কেউ অফিসে অনুপস্থিত থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। করা হতে পারে শো কজ। রাজ্য সরকারের এই নির্দেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ছুটি নিলে দিতে হবে প্রমাণপত্র।
পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীদের হটাতে রাস্তায় নেমেছে।কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজার থেকেও শহরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কোনও অবস্থাতেই রাস্তায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ, গাড়ি আটকানো, রেল অবরোধ বা পথ অবরোধ সহ্য করা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে পুলিশ। পুলিশের তরফে স্পেশাল টিম গঠন করা হয়েছে, যারা শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে নজরদারি চালাবে।
এই সর্বভারতীয় ধর্মঘটকে কেন্দ্র করে পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। ব্যাংক, বিমা, ডাক, রেল, মেট্রো-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খাতের কাজে প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বুধবারের এই বন্ধ ঘিরে উত্তেজনার পারদ চড়ছে রাজ্য জুড়ে।
