ওঙ্কার বাংলা, বিকানের : মহারাজা গঙ্গা সিং বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ত মীরাবাই সভাগৃহে ‘রঙ রাজস্থানি’ অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পেল মাতৃভাষা। বুধবার বিকানের-এ স্ববিত্তপোষিত রাজস্থানি বিভাগ ও ডিন, স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ারের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন চলকোই ফাউন্ডেশনের কর্ণধার রাজবীর সিং চলকোই। একই মঞ্চে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশবিদ, সমাজসেবী ও শিল্পপতি প্রহ্লাদ রাই গোয়েঙ্কা।
রাজস্থানি সাহিত্য, ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রসারের কথা তুলে ধরে চলকোই রাজস্থানবাসীদের কাছে আবেদন জানান, জনগণনায় ভাষা জানতে চাইলে অবশ্যই যেন তাঁরা ‘রাজস্থানি’ লেখেন। রাজস্থানি ভাষার ব্যাকরণ নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইতালি থেকে এল. পি. টেসিটোরি বিকানেরে এসে রাজস্থানি ব্যাকরণ নিয়ে বই লিখে গেছেন। তাই রাজস্থানি কোন ভাষা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অবান্তর। তাঁর জিজ্ঞাসা, “কেন আজও এই ভাষাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি ?” প্রশ্ন তোলেন, ভাষা না থাকলে ব্যাকরণ কি ভাবে সম্ভব ? চলকোই বলেন, রাজস্থানি ভাষাকে উপেক্ষা করে কীভাবে রাজস্থান এগিয়ে যেতে পারে? ডোঙ্গরি ও মণিপুরির মতো ভাষাগুলিকে সরকার স্বীকৃতি দিয়েছে, তাহলে রাজস্থানি ভাষার সঙ্গে এই বৈষম্য কেন ?
তিনি আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, “এখন অনেক বাবা-মা শিশুদের রাজস্থানি বলতে বাধা দেন। তাঁরা শিশুদের বলেন, এভাবে নয়, ঠিকভাবে কথা বলো, অর্থাৎ হিন্দি বা ইংরেজি বলার ইঙ্গিত দেন। এ অবস্থায় শিশুরা কি ভাবে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হবে ? নিজের ভাষায় কথা বলতে গিয়ে তাদের লজ্জা অনুভব করতে শেখানো হয়—এটাই আমাদের কাছে বড় বিড়ম্বনা। এই মানসিকতার কারণেই রাজস্থানি ভাষা অন্যান্য স্থানীয় ভাষার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে। তাঁর আবেদন, “এর জন্য আন্দোলন করতে হবে, কাঁদতে হবে—কারণ কাঁদা ছাড়া মা-ও দুধ খাওয়ান না।”
একই মঞ্চে উপস্থিত থেকে শিল্পপতি প্রহ্লাদ রাই গোয়েঙ্কা বলেন, “রাজস্থানি অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ভাষা। এর বহু উপভাষা ইতিমধ্যেই স্বীকৃতি পেয়েছে। রাজস্থানে নানা ধরনের উপভাষা প্রচলিত হলেও ভাষা একটাই—তা হলো রাজস্থানি।” তিনি আরও বলেন, “ভাষাই আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির বাহক। যদি আমাদের ভাষা না থাকে, তবে আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাবে।” এরপরই তিনি রাজস্থানি ভাষার ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে বলেন,”এই ভাষার চারটি স্তম্ভ। যাঁরা হলেন—মীরা, অমৃতা দেবী বিশ্নোই, পান্নাধায় ও মহারানা প্রতাপ। যাঁদের ইতিহাস থেকে যুবসমাজ অনেক কিছু শিখতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “রাজস্থানি ভাষার স্বীকৃতি আদায়ে রাজস্থানের যুবসমাজকে এগিয়ে আসতে হবে এবং এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে হবে।” তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, রাজস্থানি ভাষার স্বীকৃতির দাবিকে জোরদার করতে আগামী দিনে জয়পুরে একদিনের একটি সেমিনারের আয়োজন করা হবে। সেখানে সরকারের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজস্থানি ভাষাকে রাজভাষার মর্যাদা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হবে। তিনি আরও বলেন, শীঘ্রই তিনি রাজস্থানের শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রাথমিক শিক্ষায় রাজস্থানি ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন জানাবেন।
এর আগে মঞ্চে উপস্থিত অতিথিরা মা সরস্বতীর প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। রাজস্থানি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ড. লীলা কৌর স্বাগত ভাষণ পাঠ করেন। ডিন, স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ড. মেঘনা শর্মা তাঁর বক্তব্যে রাজস্থানি সাহিত্যকে ইতিহাসের অমূল্য ঐতিহ্য বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, বংশাবলির অধ্যয়নের পাশাপাশি বীরগাথা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ রাজস্থানি সাহিত্য করে।
এর আগে রাজস্থানি স্বাগত নৃত্যে বিভাগের ছাত্রীদের পরিবেশনা অনুষ্ঠানে রাজস্থানি রঙ ছড়িয়ে দেয়। অনুষ্ঠানের অতিথি ‘মরু কোকিলা’সীমা মিশ্রা তাঁর মধুর কণ্ঠে রাজস্থানি গান পরিবেশন করে উপস্থিত অতিথি ও শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করেন।
সভাপতির ভাষণে আচার্য মনোজ দীক্ষিত বলেন, বর্তমান সময়ে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ও দেশীয় লেখকদের দৃষ্টিতে লেখা ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরি—তবেই আমরা ইতিহাসের মূল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব।
অনুষ্ঠানে রাজস্থানি বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৃত্তি বিতরণ করা হয়। শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ড. ধর্মেশ হারওয়ানি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন অতিথি শিক্ষক রামঅবতার উপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে প্রফেসর অনিল কুমার ছাঙ্গানি, প্রফেসর রাজারাম চোয়াল, ড. অনিল কুমার দুলার, ড. গৌতম মেঘবংশী, ড. সীমা শর্মা, ড. সন্তোষ কঁবর শেখাওয়াত, উমেশ শর্মা, আশীষ শর্মা, কাউন্সিলর সুধা আচার্য, ছাইলু চারণ, বাবুলাল মোহতা সহ বিভিন্ন মহাবিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
