নিজস্ব সংবাদদাতা,রামপুরহাট : সিনেমা নয়, বাস্তব। যেন কোনও গা ছমছমে সিনেমার দৃশ্য। আর সেই দৃশ্যের কেন্দ্রবিন্দু এক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত গৃহবধূ, যাঁকে “ডাইনি” অপবাদে অর্ধনগ্ন করে জনসমক্ষে নাচাতে বাধ্য করা হল। সেই ‘তান্ত্রিক পুজো’র মঞ্চে হাতজোড় করে নাচতে বাধ্য করা হল তাঁকে, আর গ্রামবাসীরা মুগ্ধ হয়ে সেই ‘দৃশ্য’ উপভোগ করলেন!
ঘটনাটি ঘটেছে বীরভূমের রামপুরহাট থানার মাসড়া অঞ্চলের তাতঁবাঁধা গ্রামের রায়পাড়া ও ভুঁইয়াপাড়ায়। অভিযোগ, ওই গৃহবধূ দীর্ঘদিন মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। চিকিৎসা করিয়েও সুরাহা হয়নি বলে দাবি পরিবারের। এরপরেই গ্রামে আসে দুই মহিলা ওঝা, যারা সীমান্তবর্তী ঝাড়খণ্ড থেকে এসেছিলেন ‘তান্ত্রিক পুজো’ করতে। সেই পুজোই পরিণত হয় এক নারকীয় নিগ্রহে।
রবিবার সকালে হনুমান বেদির সামনে শুরু হয় ওই ‘পুজো’। অভিযোগ, ওই গৃহবধূকে ডাইনি অপবাদে বেদির সামনে নিয়ে আসা হয়। তারপর তাঁকে অর্ধনগ্ন করে জোর করে নাচানো হয়। গ্রামের বহু মানুষ তা দেখতে ভিড় জমান।
প্রত্যক্ষদর্শী গ্রামের বাসিন্দা সন্তোষ মির্ধা বলেন, “আমি খবর পেয়ে সেখানে যাই। দেখি, এক মহিলা গৃহবধূকে অর্ধনগ্ন করে পুজোর নামে নাচানো হচ্ছে। প্রতিবাদ করি। তারপর আমি সেখান থেকে পালিয়ে থানায় ফোন করি।”
পুলিশ তৎক্ষণাৎ অভিযান চালায়। বিশাল বাহিনী গ্রামে গিয়ে লাঠিচার্জ করে ভিড় সরায়। আটক করা হয় দুই মহিলা ওঝাকে। উদ্ধার করা হয় গৃহবধূ এবং তাঁর স্বামীকে। দু’জনকেই নিয়ে যাওয়া হয় রামপুরহাট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ওই গৃহবধূর চিকিৎসা চলছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রামে চিকিৎসা না চলায় এবং迷信ের বশবর্তী হয়ে গ্রামবাসীরা ‘ওঝা’ ডাকার সিদ্ধান্ত নেন। পুজোর জন্য চাঁদা তোলা হয় দুই পাড়া মিলিয়ে প্রায় ৫০-৬০টি পরিবার থেকে।
ওই গৃহবধূর ছেলে অজয় রায় বলেন, “আমার মা অনেক দিন ধরেই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। আমরা অনেক চিকিৎসা করিয়েছি। তেমন কিছু ফল হয়নি। গ্রামবাসীরাই বলেছিল ওঝা ডেকে চিকিৎসা করাতে। আমাদের তো ভালোর জন্যই করছিল।”
তবে, পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, পুরো ঘটনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গ্রেফতার হওয়া দুই ওঝার বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, প্রয়োজন হলে আরও কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে একই অঞ্চলের বটতলা গ্রামে সুনীতা মুর্মু নামে এক কিশোরীকে বিবস্ত্র করে আশেপাশের আটটি গ্রাম ঘোরানো হয়েছিল। তার অপরাধ ছিল সে ভিন সম্প্রদায়ের পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা করেছিল। সেই ভিডিও সমাজ মাধ্যমে মোবাইলে মোবাইলে ঘুরতে থাকে। এনিয়ে সারা দেশ তোলপাড় হয়ে যায়। কিশোরী পুলিশের কাছে অপরাধীদের চিনিয়ে দেওয়ায় তাকে পরের বছর সাহসিকতার পুরস্কার দেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। একই অঞ্চলে অনেকটা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হওয়ায় এলাকার মানুষের সচেতনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
