ওঙ্কার ডেস্ক : একজন মানুষ, কিছু সাধারণ সরঞ্জাম আর প্রবল জেদ—এই তিনটি জিনিস দিয়েই কি একটি দূষিত নদীর চেহারা বদলে দেওয়া সম্ভব? মধ্যপ্রদেশের রাজগড় জেলার বিয়াওরার তরুণ সুরেন্দ্র সিং চৌধুরী, সোশ্যাল মিডিয়ায় যিনি ‘বিট্টু তাবাহি’ নামে পরিচিত, সেই প্রশ্নেরই যেন বাস্তব উত্তর দিয়েছেন। প্লাস্টিক, বোতল, আবর্জনা, শ্যাওলা ও অন্যান্য বর্জ্যে ভরে যাওয়া অজনার নদীর একটি অংশ পরিষ্কারের কাজে তিনি নিজেই নেমে পড়েন। তাঁর সেই উদ্যোগই আজ তাঁকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে।
বিট্টু মূলত একজন বিএসসি পড়ুয়া। বিয়াওরায় বেড়ে ওঠার সময় থেকেই তিনি অজনার নদীর দূষিত অবস্থা দেখেছেন। নদীর আশপাশে জমে থাকা আবর্জনা, প্লাস্টিক এবং দুর্গন্ধ তাঁকে ভাবিয়ে তুলত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি চোখের সামনে দেখার পরও যখন কার্যকর পরিবর্তন চোখে পড়েনি, তখন তিনি অপেক্ষা না করে নিজেই কাজ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি, প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন, তাঁর নদী পরিষ্কারের অভিযান শুরু হয়।
শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ। প্রথমদিকে কয়েকজন বন্ধু তাঁকে সাহায্য করলেও পরে এই উদ্যোগ কার্যত একার লড়াইয়ে পরিণত হয়। পর্যাপ্ত অর্থ, বড় কোনও সংগঠনের সহায়তা কিংবা সরকারি প্রকল্প—কিছুই তাঁর হাতে ছিল না। নিজের সঞ্চয়ের টাকা খরচ করে তিনি পরিষ্কারের সরঞ্জাম কিনেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর নিজের খরচের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নদীর জলে নেমে তিনি হাতে হাতে প্লাস্টিক, বোতল, শ্যাওলা এবং অন্যান্য বর্জ্য তুলে আনতেন। কাজটি শুধু পরিশ্রমসাধ্যই ছিল না, ছিল ঝুঁকিপূর্ণও। দূষিত জলের সংস্পর্শে এসে তাঁর ত্বক ও হাতে সংক্রমণ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। কোথাও কোথাও সাপের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবু এসব তাঁকে থামাতে পারেনি।
বিট্টুর উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর কাজকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলে ধরা। তিনি নদী পরিষ্কারের আগে ও পরে ছবি এবং ভিডিও পোস্ট করতে থাকেন। ফলে মানুষ শুধু তাঁর কথা শোনেনি, চোখের সামনে পরিবর্তনটিও দেখতে পেয়েছে। নোংরা, আবর্জনায় ভরা নদীর একটি অংশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে—এই দৃশ্যই সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাঁর ভিডিও ও ছবিগুলি ভাইরাল হওয়ার পর বিট্টু তাবাহি নামটি দ্রুত পরিচিত হয়ে ওঠে।
তবে ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমালোচনাও এসেছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছিলেন, তিনি কি শুধুই সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হওয়ার জন্য এই কাজ করছেন? সেই প্রশ্নের জবাবও বিট্টু দিয়েছেন তাঁর কাজ দিয়েই। কারণ ক্যামেরার সামনে কয়েকটি ভিডিও তৈরি করা আর মাসের পর মাস দুর্গন্ধময়, দূষিত নদীতে নেমে আবর্জনা পরিষ্কার করা এক বিষয় নয়। তাঁর আগে-পরে ছবিগুলি এবং দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে যাওয়া কাজই শেষ পর্যন্ত অনেক সমালোচনার জবাব হয়ে দাঁড়ায়।
পরবর্তীতে বিট্টুর কাজ নজরে আসে বিয়াওরা পুরসভারও। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভারী যন্ত্রপাতি—জেসিবি ও পোকলেনের মতো মেশিন—ব্যবহার করে নদী থেকে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য সরানোর কাজে সহায়তা করা হয়। অর্থাৎ একজন তরুণের ব্যক্তিগত উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক সহযোগিতার পথও তৈরি করে।
এরপর আসে আরও বড় স্বীকৃতি। শিল্পপতি আনন্দ মাহিন্দ্রা-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর উদ্যোগের প্রশংসা করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পৌঁছে যায় তাঁর গল্প। নদী ও সমুদ্রের প্লাস্টিক দূষণ কমাতে কাজ করা নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সংস্থা The Ocean Cleanup-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বয়ান স্লাট সোশ্যাল মিডিয়ায় বিট্টুর কাজ দেখে তাঁকে তাঁদের সঙ্গে কাজ করার প্রস্তাব দেন। এই ঘটনা বিট্টুর ব্যক্তিগত সাফল্যকে একেবারে অন্য মাত্রা দেয়।
বিট্টু তাবাহির গল্পের আসল গুরুত্ব অবশ্য চাকরির প্রস্তাব বা সোশ্যাল মিডিয়ার জনপ্রিয়তায় নয়। তাঁর কাজ একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—কোনও জলাশয় যখন আমাদের চোখের সামনে দূষিত হয়, তখন আমরা কি শুধু অভিযোগ করব, নাকি নিজেরাও পরিবর্তনের অংশ হব? একটি নদী পরিষ্কার করা কোনও এক ব্যক্তির স্থায়ী দায়িত্ব হতে পারে না; এর জন্য প্রশাসন, স্থানীয় মানুষ এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ যে একজন সাধারণ মানুষও নিতে পারেন, বিট্টু সেটিই দেখিয়েছেন।
তাঁর গল্প আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়া শুধু বিনোদন বা জনপ্রিয়তার মাধ্যম নয়; সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি একটি পরিবেশগত আন্দোলনের শক্তিশালী হাতিয়ারও হতে পারে। বিট্টু তাঁর কাজের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছেন বলেই অজনার নদীর সমস্যাটি স্থানীয় সীমানা ছাড়িয়ে দেশের মানুষের সামনে এসেছে, পরে পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক মহলেও।
‘তাবাহি’ শব্দের অর্থ ধ্বংস। অথচ বিট্টু তাবাহি আজ যে কাজের জন্য পরিচিত, তা ধ্বংসের বিপরীত—পুনর্গঠন। তাঁর লক্ষ্য নদীর দূষণকে ‘ধ্বংস’ করে একটি পরিষ্কার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। একজন তরুণের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি নদী পরিষ্কারের গল্প নয়; এটি নাগরিক দায়িত্ব, পরিবেশ সচেতনতা এবং ‘কেউ না কেউ করবে’ মানসিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর গল্প।
অজনার নদীর জলে হাত ডুবিয়ে শুরু হওয়া সেই ছোট উদ্যোগ আজ হাজার হাজার মানুষকে ভাবাচ্ছে। আর সেই কারণেই বিট্টু তাবাহির কাহিনি কেবল ভাইরাল হওয়ার গল্প নয়—এটি প্রমাণ করে, পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় সংগঠন বা বিপুল অর্থের অপেক্ষা করতে হয় না। কখনও কখনও একজন মানুষের দৃঢ় সিদ্ধান্তই অন্যদের এগিয়ে আসার কারণ হয়ে ওঠে।