কুশল চক্রবর্তী
নাট্যকার দ্বিজেন্দ্র লাল রায় ১৯১১ সালে তার “চন্দ্রগুপ্ত” নাটকে, এই উক্তিটি করেছিলেন। “সত্য সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ” বহু ব্যাবহারে কিছুটা ক্লিশে হয়ে যাওয়া এই উক্তি আজও ভীষণভাবে প্রযোজ্য। না হলে হটাৎ কেন কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ দপ্তর ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে এত উদ্বেগ প্রকাশ করবে। গত ১০ বছরে ৫০০ উপরে ব্যাঙ্ক কর্মচারী আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ব্যাঙ্কের কাজে তিতবিরক্ত হয়ে। এই বছরের জানুয়ারি মাসেও একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অফিসার আত্মহত্যা করেছিলেন কাজের বোঝা সামলাতে না পেরে। এই বছরের মানে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে যখন ব্যাঙ্ক অফ বরদার চীফ ম্যানেজারের আত্মহননের খবর উঠে এল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের লোকেরা বুঝতে পারল আগামী দিনগুলো হয়ত আরও খারাপ আসছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কলোতে এই যে হাঁস ফাঁস করা কাজের পরিবেশ তার মুল কারণ হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের “হাসজারু” নীতি আর কর্মচারী কমিয়ে ব্যাঙ্কের লাভ দেখানোর প্রবণতা। একদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মচারীকে প্রাইভেট ব্যাংকের মত লাভ করতে হবে অন্যদিকে আবার সরকারের নানা পরিষেবা মুলক প্রকল্প সঠিক ভাবে জনগনের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। ভারত সরকারের জনধন যোজনায় এখন অবধি ৫৬ কোটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে তার মাত্র ১.৭৯% অ্যাকাউন্ট খুলেছে প্রাইভেট ব্যাঙ্ক। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে যান, দেখতে পাবেন, তাদের কর্মচরীদের প্রতিদিন কি গ্রাহক কি উচ্চপদস্থ অফিসাররা প্রাইভেট ব্যাঙ্কের কাজের উচ্চমানের সঙ্গে তাদের কাজের তুলনা করছেন। “ফুটের” সঙ্গে যে “লিটারের” তুলনা হয় না তা কে বলবে !
আজকে এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মচারীদের এত মানসিক ও দৈহিক চাপ কেন ? তার মুল কারণ হচ্ছে অনন্ত কাজের বোঝা, অসম্ভব টার্গেট, মিউচুয়াল ফাণ্ড এবং ইন্সিওরেন্স বিক্রির চাপ, যখন তখন ট্রান্সফারের ভয়। একজন ব্যাঙ্কের আধিকারিক এখন জানেনে না যে তিনি সকাল নটায় ব্যাঙ্কে এলে কখন বাড়ি ফিরবেন । তারপরে তো আছে কাজে অকাজে ব্যাঙ্কের মিটিং আর এখন কোভিডের পরে আরেকটা জিনিস জুটেছে তা হল মোবাইলের মাধ্যমে “ওয়েবনিয়ার” বা মিটিং।
সরকার বলছেন সাতটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক নাকি তাদের কর্মচারীদের স্বাস্থ্যের একটা সমীক্ষা করছেন। ভালো কথা, কিন্তু একবারও একথা বলছেন না যে, ব্যাঙ্ক কর্মচারীদের সুস্থ থাকার জন্য, তাদের মানসিক চাপ কমাবার জন্য যন্ত্রের চেয়ে মানুষের যোগান বাড়াবেন, অর্থাৎ কিনা কর্মচারী সংখ্যা বাড়াবেন ।
ব্যাঙ্ক কর্মচারী যাঁরা ২০১০ সালের আগে কাজ করতেন তাঁরা এক বাক্যে বলবেন যে ব্যাংকের এই যে গ্রুপ ডি কর্মচারী আউট সোর্স করে দেওয়া হয়েছে, তাতে সমকালীন কর্মচারীদের প্রচুর মানসিক চাপের কারণ হয়েছে। একটা হিসাব বলছে, এখনই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অন্তত ১ লক্ষ ২৫ হাজার লোক দরকার কিছুটা অন্তত কাজের বোঝা কমাতে। তা কি হবে কখনও ?
তারপর দিনের পর দিন বেড়েছে ব্যাঙ্কের উপর সাইবার ফ্রড আটকাবার কাজ। নিত্য নতুন ফ্রডের অভিযোগ ব্যাঙ্কের কাজ বাড়িয়েছে। অন্যদিকে ব্যাঙ্কের বিভিন্ন বিভাগকে বিপদমুক্ত রাখতে “কে ওইয়া সি”র উপর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ রাখতে গিয়ে ব্যাঙ্কের কাজ বেড়েছে। এছাড়াও আছে রিস্ক ম্যানেজমেন্টের কাজ। কিন্তু লোক বাড়েনি সেই অনুপাতে একদমই।
সরকার সেদিকে একবারও দেখছেন না, কারণ যে দেশে ব্যাঙ্কের কাছ থেকে ধার নিয়ে তা শোধ না দিয়ে অন্য দেশে পালানো যায়, সে দেশে ব্যাঙ্কের লোক কমিয়ে মুনাফা করা ছাড়া উপায় কী। অন্য দিকে ১৩৮০০ কোটি টাকা পাঞ্জাব নেশানাল ব্যাঙ্ক থেকে নিয়ে সটকে পড়া নীরব মোদীকে তিহর জেলে রাখতে, দিতে হবে বিশাল ঘর, সব রকমের মেডিক্যাল সুবিধা। কোনরকম চিৎকার চেঁচামিচি তিনি সহ্য করতে পারবেন না। এরপরেও যারা বলছেন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্মচারীরা খুব চাপে আছেন এটা তাঁরা বুঝতে পেরেছেন ! কথাটা একটু যেন কেমন কেমন লাগে, না ?
