অর্ণব দত্ত
৩৪ বছরের বাম আমলে, বিগত ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস আমলে এবং সদ্যগঠিত বিজেপি সরকারের আমলে শিল্পায়ন নিয়ে নানা কথা হয়েছে ও হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পরিচালিত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে বাংলার মানুষ ক্ষমতাসীন করেছিল। যদিও শিল্পায়ন ভবিষ্যতের আশা হিসেবে প্রচার করেও বামফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটে। এরপর মমতা গত ১৫ বছরে রাজ্যে শিল্পায়নের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন বলে একদিকে যেমন দাবি করেছেন, বিজনেস সামিটগুলি ঘটা করে আয়োজিত হয়েছে। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মমতা দরিদ্র জনতাকে ফুটপাথে কেটলি নিয়ে চায়ের দোকান চালাতে উপদেশ দিয়েছেন, এমনকি সংসার চালাতে দম্পতিদের চপ ভাজতেও নির্দেশ দেন।
বাংলার এই প্রথমবার ২০২৬ সালে বিজেপি সরকার গঠনের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী শিল্পায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। সময়েই প্রমাণিত হবে বেকারত্ব জর্জরিত বাংলা ডবল ইঞ্জিন সরকারের নীতির সুফল পাবে কিনা। তবে বাঙালিকে ব্যবসামুখী করার উদ্যোগ নতুন কিছু নয়। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এব্যাপারে লাগাতার প্রচার করেছেন। ইংরেজ আমলে বিএ, এমএ পাশ করে বাঙালি যুবকরা ১০ টাকা, ৩০ টাকা, ৫০ টাকার চাকরি না করে ওঁরা যেন ব্যবসামুখী হন, এই উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি আচার্য, বেঙ্গল কেমিক্যালের মতো বিরাট প্রতিষ্ঠানও স্বহস্তে তৈরি করেছেন।
যে বাংলায় আজ ব্যবসা-বাণিজ্যের আকাল ১৯৭৭ সালের পর থেকে সুদীর্ঘ কাল, সেই বাংলার অতীত খতিয়ে দেখা যাচ্ছে, বাংলা কলকারখানা চালানোর নিরিখে পরাধীন আমলে অখণ্ড ভারতে নজির সৃষ্টি করেছিল। ভারতের প্রথম কাগজের কল বানানো হয় অধুনা পশ্চিমবঙ্গের শ্রীরামপুরে। ১৮১২ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন ইতিহাসের পাতায় “শ্রীরামপুর ট্রায়ো” হিসেবে পরিচিত তিনজন সাহেব। এঁদের নাম উইলিয়াম কেরি, জসুয়া মার্সম্যান এবং উইলিয়াম ওয়ার্ড। এটি শ্রীরামপুর পেপার মিল নামে পরিচিত ছিল। পরিচালক সংস্থার নাম ছিল শ্রীরামপুর মিশন প্রেস।
২০১৪ সালে শ্রীরামপুর পেপার মিলের গেটে তালা ঝুলেছে কাঁচামাল এবং বিদ্যুতের অভাবে। সবমিলিয়ে গঙ্গার প্রান্তে অবস্থিত শ্রীরামপুর পেপার মিল ২০২ বছর চালু ছিল। ব্রিটিশ আমলে জনৈক ব্রিটিশ উদ্যোগপতি ১৮৭০ সালে কলকাতার বালিগঞ্জে রয়্যাল বেঙ্গল পেপার মিল নামে একটি বাণিজ্যিক কাগজকল স্থাপন করেছিলেন। সেটি ছিল অবিভক্ত ভারতের দ্বিতীয় স্থানাধিকারী কাগজ কল। তবে ঠিক কত সালে রয়্যাল বেঙ্গল পেপার মিলের গেটে তালা ঝুলেছে, এসম্পর্কে ঘাঁটাঘাঁটি করেও কোনও তথ্য মেলেনি স্ট্যান্ডার্ড ডিজিটাল কর্পোরেট আর্কাইভসে।
বর্তমানে ভারতের অন্তত ৯টি রাজ্য পরিচালিত হচ্ছে কাগজ কল। পূর্ব ভারতের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ সেগুলির ভিতর অন্যতম। তবে পেপার মিলের সংখ্যার নিরিখে সারা দেশের মধ্যে প্রথম স্থানাধিকারী উত্তরপ্রদেশ। মোট ৬৮টি কাগজ কল রয়েছে এখানে। এবাদে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটকের মতো একাধিক রাজ্যেও চলছে কিছু কাগজ কল। মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশেও বেশ কিছু পেপার মিল চলছে। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, লভারতে কাগজ উৎপাদন শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করছে চিনের পাশাপাশি। মুসলিম শাসনাধীনে থাকাকালীন দশম শতকে ভারতে কাগজ উৎপাদন শিল্পের সূত্রপাত।
সূত্রের খবর, ভারতীয় নাগরিকদের মাথাপিছু কাগজ ব্যবহারের পরিমাণ ২ কেজি। এদিকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে মাথাপিছু ২০০ কেজি কাগজ ব্যবহার করেন নাগরিকরা। কেন্দ্রীয় কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রকের পেশ করা সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ২০১১ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিগত সরকারের আমলে ৬ হাজার ৬৬৮টি বাণিজ্যিক সংস্থা পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাদের প্রধান কার্যালয় গুটিয়ে অন্য রাজ্যে স্থানান্তরিত করেছে।
বাম আমলে বিগত আশির দশক থেকে শুরু করে ২০০০ সাল পর্যন্ত একেক পর এক পেপার মিলের গেটে তালা ঝুলেছে। তবে, এখনও পর্যন্ত তৃণমূল সরকারের ১৫ বছরের রাজত্বে পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া পেপার মিল সংক্রান্ত তথ্য মেলেনি। তার পরিসংখ্যান সরকারের হাতেও নেই। বাম আমলে আশির দশক থেকে যে পেপার মিলগুলি বন্ধ হতে শুরু করে সেই তালিকায় একাধিক পেপার মিল আছে। যে মিলগুলি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ভারতকে পথ দেখিয়েছিল। দৃষ্টান্ত হিসেবে নাম করা যেতে পারে ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল পেপার মিল। বাম আমলে বন্ধ হওয়া পেপার মিলের মধ্যে রয়েছে ১৯৪১ সালে নির্মিত ইস্টার্ন পেপার মিলস লিমিটেডও। সবমিলিয়ে তালিকা সুদীর্ঘ।
ডবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে বাংলায় কাগজ কলগুলির ভাগ্য ফিরবে কিনা এও এখন দেখার। কেননা কেন্দ্র পেপার মিলের বিকাশে চিনকে পিছনে ফেলে পাল্লা দিতে উদ্যোগী হচ্ছে ঘোষণা করেছে একথা।