অরূপ পোদ্দার, শিলিগুড়ি : উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি এবং একাধিক প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে মঙ্গলবার একদিনের ঝটিকা সফরে উত্তরবঙ্গে এলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী প্রথমে কালিম্পংয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত পাহাড়ে পৌঁছতে পারলেন না তিনি। মাঝ আকাশ থেকেই চপার ঘুরিয়ে শিলিগুড়ির উদ্দেশে ফিরে আসতে হয় মুখ্যমন্ত্রীকে। এরপর উত্তরকন্যায় বসে টানা প্রায় চার ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠকে উত্তরবঙ্গের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রশাসনিক পর্যালোচনা করেন তিনি।
সকাল থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর সফর ঘিরে কড়া নিরাপত্তায় মুড়ে ফেলা হয়েছিল বাগডোগরা বিমানবন্দর, উত্তরকন্যা এবং কালিম্পংয়ের নির্ধারিত বৈঠকস্থল। নির্দিষ্ট সময়ে বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকে সেনাবাহিনীর চপারে কালিম্পংয়ের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। কিন্তু পাহাড়ের প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে কালিম্পংয়ে অবতরণ সম্ভব হয়নি। বেশ কিছুক্ষণ আকাশে চক্কর দেওয়ার পর বাধ্য হয়ে শিলিগুড়িতে ফিরে আসে চপার। এরপর উত্তরকন্যার পাশের ভিডিওকন গ্রাউন্ডে অবতরণ করেন মুখ্যমন্ত্রী এবং সেখান থেকে সড়কপথে উত্তরকন্যায় পৌঁছন।
উত্তরকন্যায় আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক-সহ বিভিন্ন দপ্তরের আধিকারিক এবং উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্তারা। বেলা প্রায় দুটো থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত চলে দীর্ঘ বৈঠক। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পর্যটনমন্ত্রী শংকর ঘোষ জানান, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের প্রায় সমস্ত এইচওডি ভার্চুয়ালি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি রেল, বিমানবন্দর, বিএসএফ-সহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরের আধিকারিকরাও বৈঠকে যোগ দেন। আগের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলির কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে এদিন বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পায়। মালদার ভূতনির বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। উত্তরবঙ্গের যে কোনও প্রান্তে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত মোকাবিলার জন্য এনডিআরএফ ও এসডিআরএফ-কে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের মাধ্যমে যে সমস্ত কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে, সেইসব এলাকার মানুষের প্রতিক্রিয়াও নেওয়া হয়। রেল, বিমানবন্দর ও বিএসএফের জমি এবং নির্মাণ সংক্রান্ত যে সমস্ত সমস্যা এখনও বাকি ছিল, কেন্দ্র ও রাজ্যের আধিকারিকদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা করিয়ে সেগুলির সমাধানের পথও বের করা হয়েছে।
পাহাড়ের জন্যও এদিন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। কালিম্পংয়ে যেতে না পারায় মুখ্যমন্ত্রী দুঃখপ্রকাশ করেছেন এবং খুব দ্রুত পাহাড় সফরে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান পর্যটনমন্ত্রী। পাশাপাশি ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের আওতায় পাহাড়ে প্রায় ২৫০ কোটি টাকার কাজের ঘোষণা করা হয়েছে। এনএইচপিসির সঙ্গে যৌথভাবে এই কাজগুলি করা হবে। উত্তরকন্যা থেকেই যাতে উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু দপ্তরের কাজ পরিচালনা করা যায় এবং প্রতিটি বিষয়ে কলকাতায় ছুটতে না হয়, সেই বিষয়েও বৈঠকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এদিন স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হয়। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালকে ঢেলে সাজানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, কোচবিহার, মালদা-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন হাসপাতালের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং পরিষেবা নিয়েও আলোচনা হয়। মাইগ্রেন্ট লেবারদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার বিষয়েও চিন্তাভাবনা করা হয়েছে। বৈঠক শেষে ভিডিওকন গ্রাউন্ড হয়ে চপারে বাগডোগরা যাওয়ার কথা থাকলেও সেখানে কিছু বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সড়কপথেই বাগডোগরা বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন মুখ্যমন্ত্রী। পরে বাগডোগরা থেকে বিমানযোগে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হন তিনি।