নিজস্ব সংবাদদাতা : কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার প্রায় ৪০টি রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানের লাইসেন্স বাতিল করল খাদ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার চলতি খাদ্য সুরক্ষা অভিযানে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় তল্লাশি চালায় কলকাতার পৌরসংস্থার স্বাস্থ্য বিভাগ। প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপের মুখে পড়ে সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলিও। যার মধ্যে রয়েছে ৯৪ বছরের পুরনো ‘নিজামস’ রেস্তোরাঁ, ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের জনপ্রিয় বিরিয়ানির দোকান ‘শিমলা বিরিয়ানি’, রিপন স্ট্রিটে অবস্থিত ‘করিমস’-এর একটি শাখা, নাগেরবাজার এলাকার ‘আরসালান’-এর একটি শাখা, ‘ডন জিওভানিস’, ‘বলরাম মল্লিক ও রাধারমণ মল্লিক’, ‘শ্রী হরি’ সহ বেশকিছু নামিদামী রেস্তোরাঁ ও খাবারের বিপনি।
পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডে জানিয়েছেন, পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যবিধি বা পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পৌরসংস্থার সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে স্মিতা পাণ্ডে বলেন, “এই অভিজ্ঞতাটি ছিল চোখ খুলে দেওয়ার মতো। আমাদের ৮৯টি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে হয়েছে, ১১২টি প্রতিষ্ঠানকে ‘খাদ্য সুরক্ষা ও মানদণ্ড আইন’-এর ৩৮ নম্বর ধারার অধীনে ৪০টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিতের নোটিশ জারি করতে হয়েছে।”
জানা গেছে, এইসব দোকানের বেশিরভাগেরই রান্নাঘর অবস্থা অত্যন্ত “অস্বাস্থ্যকর”। কিছু দোকান থেকে সংগ্রহ করা খাবারের নমুনায় অনুপযুক্ত রঙের ব্যবহার, বাসি খাবার, কাঁচা খাবারে ছত্রাকের উপস্থিতি এবং খাবার রাখার জায়গায় পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রবের মতো বিষয় ধরা পড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্মিতা পাণ্ডে বলেন, “মূলত স্বাস্থ্যবিধি বা পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিই ছিল মুখ্য। তবে মিষ্টির দোকানগুলোর অবস্থা ছিল উদ্বেগজনক। সেখানে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন থাকা উচিত, কিন্তু তা ছিল না। সামনেই দুর্গাপূজা। আমরা আশা করি তারা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে এবং আমরা আরও ভালো পরিষেবা পাব।”
রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগ ও কলকাতা পৌরসংস্থার একটি যৌথ দল রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও মিষ্টির দোকানসহ প্রায় ১৬২টি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। রেস্তোরাঁগুলোতে পরিদর্শনের সময় দেখা গেছে, অনেক জায়গায় মশলাসহ বিভিন্ন উপকরণ প্যাকেটের গায়ে লেখা মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরেও ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ম লঙ্ঘন করে কোনো কোনো রেস্তোরাঁয় রান্নার বা ভাজার তেল তিনবারের বেশি ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া জানিয়েছেন, “পূর্ববর্তী সরকার এই বিষয়গুলোর দিকে নজর দেয়নি। বর্তমানে ‘ভোক্তা সুরক্ষা সপ্তাহ’ চলছে। আমরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানগুলো যাতে নির্দেশিকা মেনে খাবার ও মিষ্টি প্রস্তুত করে, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি”।
জানা গেছে, যেসব খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তাদের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কর্মশালা আয়োজন করা হবে। সেখানে তাঁদের খাদ্য সুরক্ষা নির্দেশিকা মেনে চলার গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করা হবে। অশোকবাবু বলেন, “হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে সরবরাহ করা বোতলজাত পানীয়র পরীক্ষা করা হবে। যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে তাদের ব্যবসা চালানোর অনুমতি দেওয়া হবে; আর যারা ব্যর্থ হবে, তাদের ব্যবসা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হবে।”
গত ১ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘ভোক্তা সুরক্ষা সপ্তাহ’-এর সূচনা করেছিলেন। এরপরই রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তর, বিভিন্ন কর্পোরেশন ও পৌরসভার স্বাস্থ্য বিভাগ এবং এনফোর্সমেন্ট শাখা কয়েক দিন ধরে ধারাবাহিক অভিযান চালায়। সোমবার অভিজাত এলাকা গড়িয়াহাটে ১০ কেজিরও বেশি মাংস বাজেয়াপ্ত ও নষ্ট করা হয়। কারণ তা খাওয়ার অনুপযুক্ত বলে প্রমাণিত হয়েছিল। একই সময়ে বউবাজারের ছানা পট্টিতেও অভিযান চালানো হয়; সেখানে ছয় কেজি ছানা ও পাঁচ কেজি খোয়া ক্ষীর খাওয়ার অযোগ্য বলে শনাক্ত করা হয়।
বড়বাজারের পোস্তার মশলার বাজারে বিক্রেতাদের কাছে এমন সব পণ্য মজুত ছিল, যার প্যাকেটে বাধ্যতামূলক ‘মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ’ উল্লেখ করা ছিল না।
গত সপ্তাহে পরিচালিত এই অভিযানের সময় দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ২১৫টি, উত্তর ২৪ পরগনায় ১২৮টি, পূর্ব বর্ধমানে ১২৯টি এবং কলকাতায় ৯৬টি প্রতিষ্ঠান খাদ্য সুরক্ষার মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। যার মধ্যে পার্ক স্ট্রিট ও তপসিয়ার খাবারের দোকানও ছিল।