
নয়ন বিশ্বাস রকি
বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হল চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের ৯২% আমদানি-রপ্তানি এই বন্দর দিয়েই হয়। এই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য ওঠা-নামা করে। সরকারের রাজস্ব আয়ের সিংহভাগ আসে এই বন্দর থেকে। সেই হৃৎপিণ্ডটাই কি এখন বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে ?
আজ সারা দেশের মানুষের মুখে একটাই প্রশ্ন – ইউনূসের পথেই হাঁটছে কি বিএনপি ? মনে আছে, ক্ষমতা দখলের পর পরই ইউনূস প্রথম যে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তা ছিল চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে। তিনি চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক অংশ – নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT) বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। তখন আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। বলেছিলাম, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এটি দেশ বিক্রির শামিল। কারণ বন্দর শুধু ব্যবসা না, এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। এটি একটি দেশের স্বাধীনতার প্রতীক।
আজ সেই একই পথে হাঁটছে বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন তথাকথিত সরকারও একই প্রকল্প এগিয়ে নিচ্ছে। আমরা গোপন সূত্রে জানতে পেরেছি, দুবাই ভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং ডেনমার্কের মায়েরস্ক লাইনের সাথে চুক্তি চূড়ান্ত করার কাজ প্রায় শেষ। কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার নেই, কোনো সংসদীয় আলোচনা নেই, কোনো সাংবাদিকদের জানানো হয়নি। সব হচ্ছে রাতের আঁধারে, গোপনে।
চট্টগ্রাম বন্দর বঙ্গোপসাগরের প্রবেশদ্বার। এটি শুধু বাংলাদেশের না, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। এখানে আমেরিকা, ভারত ও চিনের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ জড়িত। বিদেশিদের হাতে বন্দর গেলে বাংলাদেশের নৌ-নিরাপত্তা, কাস্টমস ডাটা, সামরিক পণ্য আমদানি-রপ্তানির গোপন তথ্য সব বিদেশিদের হাতে চলে যাবে। একটি স্বাধীন দেশের জন্য এর চেয়ে বড় হুমকি আর কি হতে পারে ?
এই বন্দর বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা লাভ করে। এই লাভের টাকা রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হয়, যার উপর নির্ভর করে দেশের নানান উন্নয়ন প্রকল্প। যদি বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়া হয়, তাহলে এই লাভের ৭০% চলে যাবে বিদেশি কোম্পানির পকেটে। অথচ এই টাকায় পদ্মা সেতুর মতো আরও একটি মেগা প্রকল্প করা যেত। শেখ হাসিনা সরকার বন্দরকে লোকসানি প্রতিষ্ঠান থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল। আজ সেই লাভ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
এর ফলে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হবে। বন্দরে ৬ হাজার স্থায়ী ও ১৫ হাজার অস্থায়ী শ্রমিক কাজ করে। তাদের পরিবার এই বন্দরের উপর নির্ভরশীল। বিদেশি কোম্পানি আসলে তাদের চাকরি থাকবে না। বিশ্বের ইতিহাস বলে, ডিপি ওয়ার্ল্ড যেখানেই গেছে, সেখানেই স্থানীয় শ্রমিক ছাঁটাই করে নিজেদের লোক বসিয়েছে। তাহলে এই ২১ হাজার পরিবার কোথায় যাবে ?
শেখ হাসিনা সবসময় বলতেন, “আমরা কারো কাছে দেশ বিক্রি করবো না। আমার দেশের সম্পদ আমার দেশেরই থাকবে।” তিনি বন্দরকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে রেখেছিলেন, বিদেশিদের হাতে দেননি। আজ ইউনূস-বিএনপি সরকার সেই সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছে। এটি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী এবং ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে বেইমানি। জনগণ আজ প্রশ্ন করছে – বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং বিদেশি প্রভুদের খুশি করতে কি দেশের হৃৎপিণ্ড বিক্রি করতে হবে ? ১৮ কোটি মানুষের রক্তে গড়া বন্দর কি দুবাইয়ের কোম্পানির হবে ? তারেক রহমান কি ইউনূসের দেখানো পথেই দেশকে বিক্রি করে দিতে চান ?
লেখক বাংলাদেশের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজকর্মী