মৌসুমী পাল: দক্ষিণ বস্তারের ঘন জঙ্গল থেকে অন্ধ্র–তেলেঙ্গানা–ছত্তিশগড়ের ত্রিরাষ্ট্র সীমান্ত, প্রায় দু’দশক ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ, অদৃশ্য ও রহস্যময় আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত ছিল সিপিআই (মাওবাদী)-র শীর্ষ কমান্ডার মাদবি হিদমা। ১৮ নভেম্বর মঙ্গলবার ভোররাতে বস্তারের ‘জঙ্গলের ছায়ামূর্তি’ নামে পরিচিত মাওনেতা হিদমা ও তাঁর ৫ সঙ্গী নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। এলাকার এত প্রভাবশালী মাওনেতার মৃত্যুর পর মাওবাদী সংগঠন গুলি ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মনে করছে প্রশাসন।
হিদমা ও তাঁর সহকর্মীদের মৃত্যুর পর আন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশ সাংবাদিক বৈঠকে জানান, গোপন সুত্রে খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাতে ঐ এলাকায় হামলা চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। এই অপারেশন অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং ছত্তিশগঢ তিন রাজ্যের নিরাপত্তা বাহিনীর যৌথ উদ্দ্যোগে সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশ সুত্রে জানা গেছে, হিদমা বাহিনীর গুলির লড়াইয়ে মোট ৬ জন মাওবাদীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে দুইজন মহিলা এবং ৪ জন পুরুষ ছিলেন। পুলিশি হামলায় হিদমা এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রাজিরও মৃত্যু হয়। পুলিশ তাঁদের দেহ সনাক্ত করেছে বলেও জানানো হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রশাসন।
পুলিশি সুত্রে জানানো হয়েছে যে, নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র আসে যে, হিদমা ত্রিরাষ্ট্র জঙ্গলে একটি বড় বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন। এই সূত্র ধরে অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের এলিট গ্রে হাউন্ডস, ছত্তিশগড় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী মিলিয়ে অভিযান সংগঠিত হয়। ব্যবহার করা হয় জিপিএস-ভিত্তিক নজরদারি, দূরনিয়ন্ত্রিত ড্রোন, জঙ্গলের অভ্যন্তরে থাকা স্থানীয় সূত্র এবং সাটেলাইট ইমেজিং। সব মিলিয়ে নির্দিষ্ট করা হয় হিদমার সম্ভাব্য অবস্থান। অন্ধ্রপ্রদেশের মাড়েদুমিলি জঙ্গলে যে সংঘর্ষে হিদমা নিহত হন, সেখানে নিরাপত্তা বাহিনী প্রথমে মাওবাদীদের ক্যাম্প চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। শুরু হয় প্রবল গোলাগুলি, যা প্রায় আধঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে। শেষ পর্যন্ত গুলির আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন হিদমা এবং তাঁর সঙ্গে থাকা আরও কয়েকজন মাওবাদী সদস্য। পরে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হয় একাধিক একে–৪৭ রাইফেল, গোলাবারুদ, নথি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার ইঙ্গিত।
মাদবি হিদমা দেশের দীর্ঘ মাওবাদী ইতিহাসে ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি শুধু গেরিলা বাহিনী পরিচালনাই করেননি, পুরো আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘অপারেশনাল মস্তিষ্ক’ হিসেবেও কাজ করেছেন। বস্তারের গ্রামের দরিদ্র আদিবাসী ছেলে থেকে দণ্ডকারণ্য অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নাম হয়ে ওঠার এই পথটাই তাঁকে আলাদা করে তুলে ধরে। ছত্তিশগড়ের সুকমা জেলার পুজারি কানকরের গণ্ডায় জন্মানো হিদমা কোনও নিয়মিত শিক্ষালাভ করতে পারেননি। কিশোর বয়সেই মাওবাদী সংগঠনের কাজ তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। ছোটো বয়সেই মাওবাদী প্রচার কমিটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরে পিএলজিএ-র বিভিন্ন স্তরে কাজ শুরু করেন। দক্ষিণ বস্তারের অনমনীয় ভূপ্রকৃতি, জঙ্গলের ভেতরের প্রতিটি পথ, গোপন চলাচলের রুট, নিরাপত্তাবাহিনীর সম্ভবত কোন দিক দিয়ে অভিযান ঢুকতে পারে, এই সব বিষয়ে তাঁর অসাধারণ জ্ঞানই তাঁকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।
কয়েক বছরের মধ্যেই হিদমা উঠে আসেন পিএলজিএ ব্যাটেলিয়ন–১-এর নেতৃত্বে, যা মাওবাদী সংগঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধবাহিনী হিসেবে পরিচিত। হিদমা ‘পিপল লিবারেশন গোরিলা আর্মি’-র জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠেন। দণ্ডকারণ্য স্পেশাল জোনাল কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে তিনি বাস্তবিক অর্থে বস্তার অঞ্চলে লাল বাহিনীর মুখ হয়ে ওঠেন।
সরকারের সামনে মাও নেতা হিদমার পরিচিতি মূলত তৈরি হয় তাঁর নির্মম পরিকল্পিত অপারেশনগুলির জন্য। ২০১০ সালের দান্তেওয়াড়ার তাদমেটলা হামলায় ৭৬ জন সিআরপিএফ জওয়ান শহিদ হন এই পরিকল্পনার অন্যতম মাথা ছিলেন হিদমা। তিন বছর পরে জিরাম ভ্যালি হামলায় কংগ্রেস নেতা মহেন্দ্র কর্মা, বিদ্যাচরণ শুক্ল-সহ তৎকালীন ছত্তিশগড়ের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে খুন করার অপারেশনেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। সম্প্রতি ২০২১ সালে সুকমা এনকাউন্টারে মোট ২২ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়াও কমবেশি ২৬টি অপরেশনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হিদমা। এসব ছাড়াও বহু আইইডি হামলা, অ্যামবুশ, গ্রাম আক্রমণ, অস্ত্র ছিনতাই ও পুলিশের ওপর আকস্মিক বাহিনীর বিস্তার এসবের নেতৃত্ব দিয়েছেন হিদমাই। নিরাপত্তা রক্ষীদের মতে, তাঁর কাজ করার ধরন ছিল দ্রুত সিদ্ধান্ত, জঙ্গলের সুবিধা কাজে লাগিয়ে হঠাৎ আক্রমণ, তারপর মুহূর্তে গা ঢাকা দেওয়া। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তাই তিনি কেবল এক রাজ্যের সমস্যা নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত হন। অন্ধ্রপ্রদেশের ডিজিপি হারিশ কিমার গুপ্তা জানিয়েছেন, “এই অপরেশন অ্যান্টি-মাও অপরেশন গুলির মধ্যে অন্যতম”।
দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে হিদমা ছিলেন মাওবাদী আন্দোলনের পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা। মাঠপর্যায়ের আদর্শিক প্রশিক্ষক, সংগঠকের ভূমিকায় অত্যন্ত প্রভাবশালী, এবং নতুন যোদ্ধা তৈরি ও আদিবাসী গ্রামগুলিকে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল মুখ ছিল হিদমা। এই কারণে কেন্দ্রীয় সরকার, র, এনআইএ, গ্রে হাউন্ডস, ছত্তিশগড় ও তেলেঙ্গানা পুলিশ, সবাই মিলে তাঁকে ধরতে দীর্ঘদিন ধরে সমন্বিত অভিযান চালিয়েছে। এমনকি তাঁর মাথার উপর ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি টাকার ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক। প্রতিবারই জঙ্গলের অপ্রবেশ্য অঞ্চলে হিদমা আগেভাগেই খবর পেয়ে সরে পড়তেন। হিদমা নিজের চারিপাশে বলয়ে নিরাপত্তা মোতায়েন করেছিলেন।
বিগত কয়েক বছর ধরে মাওবাদী আন্দোলন অনেকটা দুর্বল হয়ে পরেছে। তার কারণ হিসাবে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে মাওবাদী সংগঠনের ভেতরেও তৈরি হয়েছিল তীব্র মতবিরোধ। আদর্শগত টানাপড়েন, তহবিলের সংকট, আদিবাসীদের ওপর সংগঠনের চাপ বাড়া, নতুন প্রজন্মের আগ্রহ হারানো এবং নেতৃত্বের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, এই সব কিছুর ফলে দলে বিভাজন শুরু হয়। এক সময় হিদমার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত পিএলজিএ-র সদস্য ওয়াম লাখ্মু-সহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার আত্মসমর্পণ করেন। দলের মধ্যে কেউ কেউ নিরাপত্তা বাহিনীকে খবর দেয় হিদমার নিয়মিত চলার রুট, লুকিয়ে থাকার জায়গা, তাঁর যোগাযোগ পদ্ধতি এবং বৈঠকের সময়সূচি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সংগঠনের ভিতরে এই ভাঙনই মূলত তাঁর দীর্ঘ অদৃশ্যতার জালকে দুর্বল করে দেয়। প্রসঙ্গত, এক সপ্তাহ আগেই মাদবি হিদমার মা মাদবি পুঞ্জি সাংবাদিকদে সামনে নিজের সন্তানকে অস্ত্র ছেড়ে আত্মসমর্পন করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন।
হিদমার মৃত্যু মাওবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে একটি বড় মোড়। এর আগে যেমন কিশেনজি, কোন্ডা রেড্ডিমান, আজাদ বা সায়ন্তনদের মৃত্যু সংগঠনকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল, তেমনই হিদমার মৃত্যু বর্তমান মাওবাদী নেটওয়ার্ককে সবচেয়ে গভীর ধাক্কা দিয়েছে। কারণ তাঁর অভিজ্ঞতা, কৌশলগত জ্ঞান ও জঙ্গলের ওপর ছিল অসামান্য। হিদমার মৃত্যুর পরও আশঙ্কা রয়েছে যে জঙ্গলের মধ্যে এখনও সক্রিয় বহু ছোট দল ভবিষ্যতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে পারে।
হিদমার মৃত্যুর পর মাওবাদী আন্দোলন একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাবে কি না তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রশাসন, কারণ দীর্ঘ জঙ্গলে বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি উপড়ে ফেলতে আরও সময় লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত ভারতের মাওবাদী ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর নামগুলির মধ্যে অন্যতম হিদমার পতন নিরাপত্তা বাহিনীর এক বিরাট সাফল্য।
