মৌসুমী পাল
প্রেমে পড়ে মানুষ অনেক অসাধ্যই সাধ্য করে, এমন অনেক নজির রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি দিল্লি বিস্ফোরণ কান্ডে প্রেম ভালোবাসার অন্যরকম ভয়াবহ পরিণতি দেখা গেছে। আধুনিক চিন্তাধারায় শিক্ষিত চিকিৎসক শাহীন সাঈদ তারই জুনিয়র মুজ্জামিল শাকিলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েই দেশে সন্ত্রাসবাদের এক ভিত্তি স্থাপন করেছে, তা নিশ্চিত করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারি সংস্থা।
দিল্লির সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ মামলায় দুই চিকিৎসক শাহীন সাঈদ ও মুজাম্মিল শাকিলকে কেন্দ্র করে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা শুধু তদন্তের অগ্রগতি নয় সমাজের অদৃশ্য ভাঙনের কথাও স্পষ্ট করে দেয়। একজন সফল ডাক্তার, দীর্ঘদিনের চিকিৎসাশিক্ষা, স্থিতিশীল পারিবারিক সম্পর্ক, সবকিছুর মাঝেও কীভাবে উগ্রতার স্রোত নিঃশব্দে প্রবেশ করে, ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে মানুষের ভিতরকার নিরাপদ বোধগুলো ভেঙে পড়ে, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সুত্রের খবর অনুসারে, শাহীন সাঈদের জীবন শুরু হয়েছিল একেবারে সাধারণ পথেই। লখনউ-এর এক সম্মানিত এবং স্বনামধন্য পরিবারের মেয়ে সাঈদ। ডাক্তারি পড়া, বিয়ে, সন্তান, পেশাগত স্থিরতা। পরে ব্যক্তিগত সম্পর্কে ভাঙন, নতুন সম্পর্কের খোঁজ, নতুন শুরু যেটা বহু মানুষের জীবনেই ঘটে। কিন্তু ঠিক এই স্বাভাবিক ওঠা-নামার ফাঁকেই সন্দেহভাজন চক্রগুলো জায়গা খুঁজে নেয়। কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তে উঠে আসা তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনার নামে গড়ে ওঠা কিছু সন্ত্রাসগোষ্ঠীই ব্যক্তিগত দুর্বলতার মুহূর্ত গুলোকে কাজে লাগিয়ে শাহীনকে ধীরে ধীরে নিজেদের বৃত্তে টেনেছিল। এই প্যাটার্ন একদিনে তৈরি হয় না সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, পরিচয়ের সংকট, সম্পর্কভাঙার মানসিক চাপ, নতুন ভরসার খোঁজ এসবের সমন্বয়েই অনেকে ধীরে ধীরে এমন পথে হেঁটে ফেলে যেখানে ফিরে আসার রাস্তা আর পরিষ্কার থাকে না, থাকে শুধু নির্মমতা।
উল্লেখ্য ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হল পেশাগত পরিচয়ের অপব্যবহার। একজন ডাক্তার সমাজে আস্থার প্রতীক। মানুষ জীবনের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় যাদের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, সেই পেশা একাধিক সদস্য যদি সন্ত্রাসচক্রের অংশ হয়ে ওঠে, তা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস, আস্থাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দেয়। তদন্তকারী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শাহীন শুধু নিজে যুক্ত ছিলেন না, বরং দিল্লির সন্ত্রাসবাদের ‘ডক্টর মডিউল’-ও তৈরিতে বিশেষ ভূমিকাও ছিল তার।
কিন্তু অন্যদিকে সাঈদের পরিবার ও পরিচিতদের কাছে সাঈদের এই আচরন একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তারা সবাই বলছেন শাহীনকে কখনও এমন মনোভাবের মানুষ হিসেবে মনে হয়নি। বরাবরই সাঈদ আধুনিক মানসিকতার বলেই জানা গেছে। তার প্রথম এবং প্রাক্তন স্বামী জাফর হায়াত জানিয়েছেন, “সাঈদ বরাবর উন্মুক্ত চিন্তাধারার মানুষ ছিলেন। মুসলিম সম্প্রদায়ে প্রতিপালন হলেও কোনদিন বোরখা পরেনি সে”। তিনি আরও জানান, দেশের বাইরে গিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলেন, নিজেদের এবং সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য। সেই শাহীন সাঈদের এমন উগ্র মানসিকতার কথা সামনে আসতেই বিস্মিত হয় তার পরিবার। তার এই পরিবর্তন আশেপাশের লোকজনদের ভাবিয়েছে। এর থেকেও ভাববার বিষয়, আধুনিক সমাজে এই নিঃশব্দ পরিবর্তনগুলি নজরে না পড়লে বিপদ আরও প্রবল হয়ে উঠবে।
সুত্রের খবর অনুযায়ী ২০২৩ সালে সেপ্টম্বর মাসে সাঈদ ও শাকিল আল ফালহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংলগ্ন এক মসজিদে সম্পুর্ণ ইসলামিক পদ্ধতি অনুসরণ করে বিবাহ করে। মুজ্জামিল শাকিল ছিল কাশ্মিরের বাসিন্দা এবং পাকিস্তান মদতপুষ্ট জঙ্গি গোষ্টী জাইশ-ই-মহম্মদ এর সক্রীয় সদস্য। শাকিলের সঙ্গে বিয়ের পরই ধর্মের নামে চলা সন্ত্রাস কার্যাকলাপের সঙ্গে যুক্ত হয় সাঈদও। তারপরই জাইশ-ই-মহম্মদের মহিলা উইং ‘জামত-উল-মমিনাত’-এর আশ্রয়ে আসে। সেখানে জাইশ-ই-মহম্মদের সুপ্রিমো মাসুদ আজহারের বোন সাদিয়া আজহারের সংস্পর্শে আসে ডক্টর সাঈদ। সুত্রের খবর অনুযায়ী ‘জামত-উল-মমিনাত’-এর ভারতীয় শাখার প্রতিনিধিত্ব করছিল সাঈদ নিজেই।
দিল্লির বিস্ফোরণ, যার তদন্তে এই দুই চিকিৎসকের নাম সামনে এসেছে, শুধু একটি অপরাধ নয় এটি একটি সতর্কবার্তা। সন্ত্রাসবাদের চেহারা বদলে যাচ্ছে। মুখোশ পরা যোদ্ধা বা সীমান্তের ওপারের প্রশিক্ষিত দল নয় এখন দেশের ভিতরেই শিক্ষিত, পেশাদার, আপাত সাধারণ জীবনের মানুষও এই নেটওয়ার্কে জড়িয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন মোকাবিলা করতে হলে শুধু গোয়েন্দা তথ্য বা কঠোর আইন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দেশের শিক্ষিত সমাজকে কেন কিভাবে লক্ষ্য করছে এই সন্ত্রাসবাদ গোষ্টী গুলো সেদিকে কড়া নজর দেওয়া।
