ওঙ্কার ডেস্ক: নাম ছিল ডাঃ এ কে রায়রু গোপাল। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁকে চিনত ‘২ টাকার ডাক্তার’ নামেই। কারণ, চিকিৎসার বিনিময়ে অর্ধশতক ধরে মাত্র ২ টাকাই নিতেন তিনি। সেই মানুষটির জীবন প্রদীপ নিভে গেল ৮০ বছর বয়সে। তাঁর প্রয়াণে শুধু কেরল নয়, গোটা দেশ হারাল এক নিঃস্বার্থ জনচিকিৎসকের প্রতীককে।
প্রায় ৬০ বছর আগে ডাক্তারি জীবনে পা রাখা রায়রু গোপালের জীবনে যে সংকল্পের বীজ বোনা হয়েছিল, তা করেছিলেন তাঁর বাবা ডাঃ এ গোপালন নাম্বিয়ার। কান্নুর জেলার এই খ্যাতনামা চিকিৎসক একদিন ছেলেকে বলেছিলেন, “যদি কেবল টাকা কামানোর ইচ্ছা থাকে, তাহলে ডাক্তারি পেশা নয়, অন্য কিছু বেছে নাও।” বাবার সেই কথা ছিল আজীবনের দিশার মতো। আর সেই পথেই তিনি হয়ে উঠলেন গরিব, নিরুপায়, চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের অবলম্বন।
চিকিৎসক রায়রু গোপাল এমবিবিএস পাশ করেন কোঝিকোড় মেডিক্যাল কলেজ থেকে। কর্মজীবনের শুরুতে কান্নুরের একটি সরকারি হাসপাতালে কিছুদিন কাজ করলেও পরে তালাপ এলাকায় নিজের একটি ছোট চেম্বার খোলেন। সেখানেই শুরু হয় তাঁর ‘২ টাকার চিকিৎসা’। পরবর্তীকালে তিনি মণিক্কাকাভু মন্দিরের কাছে নিজস্ব বাসভবনে চেম্বার স্থানান্তর করেন। স্থানীয়দের কাছে তাঁর পরিচিতি এতটাই ছিল যে, তাঁর চেম্বারই হয়ে উঠেছিল এলাকার বাসস্টপের নাম। সব বাসরুটেই সেখানে দাঁড়াত বাস।
ভোর ৪টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলত তাঁর চিকিৎসা পরিষেবা। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময়েই দেখা যেত, রাত্রি ৩টের সময়ই রোগীরা আসতে শুরু করেছেন। রায়রুর নিজের কথায়, শ্রমজীবী মানুষের সময়ের দাম তিনি জানতেন, তাই তাঁদের কাজের সময় যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য এত ভোরে চিকিৎসা শুরু করতেন। কোনও কোনও দিনে ৩০০ রোগী, আবার গড়ে প্রতিদিন ২০০ রোগী দেখতেন তিনি। হিসেব বলছে, সারাজীবনে প্রায় ১৮ লক্ষ রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছেন এই একরোখা মানুষটি। তিনি শুধু ভিজিট নিতেন কম, এমনই নয় কম খরচে রোগ নিরাময়ের লক্ষ্যেও কাজ করতেন। বরাবর কম দামের ওষুধ লিখতেন। রোগীর পকেটে টাকা না থাকলে ফিজ তো নয়ই, ওষুধের টাকাও তিনি নিজে দিতেন। “চিকিৎসা লাভের জন্য নয়, সেবার জন্য” এই আদর্শে অটুট ছিলেন তিনি। শেষদিকে বয়সজনিত কারণে সামান্য পরিবর্তন করে ফিজ বাড়িয়ে ১০ টাকা করেছিলেন। তবুও, যাঁদের কাছে সেটুকুও দেওয়া সম্ভব ছিল না, তাঁদের জন্যও দরজা খোলা ছিল এই মানবিক চিকিৎসকের।
ডাঃ রায়রুর মৃত্যুতে গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। তিনি বলেন, “রায়রু গোপাল ছিলেন জনগণের ডাক্তার। নিরলসভাবে তিনি সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছেন। তাঁর কাজ আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দেবে”।
