পূর্ব বর্ধমান, বুদবুদ: আজ মহালয়ার সকাল।হাতে গোনা আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপরই দেবী দুর্গার আরাধনায় মত্ত হবে আট থেকে আশি। আর সেই আরাধনার প্রস্তুতি ঘিরেই এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে বুদবুদের সোঁয়াই গ্রামের মুখার্জি পরিবারে। দীর্ঘ ৩৩৪ বছর ধরে প্রাচীন রীতি ও ঐতিহ্য মেনে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে এই পরিবারে। এই পুজোর অন্যতম আকর্ষণ নবমীর দিনের মোষ বলি। যা দেখতে প্রতিবছর আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বহু মানুষ ভিড় জমান।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩৩৪ বছর আগে বাসুদেব মুখার্জির হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়। বাসুদেব মুখার্জির আদি বাড়ি ছিল পূর্ব বর্ধমানের বাকলসার গ্রামে। সেখানে তাঁদের বাড়িতে দুর্গাপুজো হতো। পরবর্তীকালে পড়াশোনার জন্য তিনি বুদবুদের সোঁয়াই গ্রামে আসেন। শোনা যায়, সেই সময় গ্রামে একটি টোল বা পাঠশালা ছিল। এখানেই পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর বিয়ে হয় এবং পরে তিনি সোঁয়াই গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
গ্রামে বসবাস শুরু করার পর নিজের বাড়ির দুর্গাপুজো বন্ধ না করে দেবীকে সোঁয়াই গ্রামে নিয়ে আসেন বাসুদেব মুখার্জি। তবে দেবীকে কাঁধে করে নিয়ে আসার সময় ঘটে এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, সেই সময় বর্ধমানের রাজা সৈন্যদের নিয়ে ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। পথে রাজার সৈন্যদের সঙ্গে দেবীকে বহন করে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের মুখোমুখি দেখা হয়। দুপক্ষের কেউই রাস্তা ছাড়তে রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত রাজা নিজেই এগিয়ে এসে ঘটনার কারণ জানতে পারেন। সব শুনে তিনি দেবীকে প্রণাম করেন এবং নিজেই রাস্তা ছেড়ে দেন। পরে দেবীর পুজোর জন্য বেশ কিছু জমিও দান করেন বলে কথিত রয়েছে। সেই থেকেই সোঁয়াই গ্রামে ধুমধাম করে দুর্গাপুজোর প্রচলন শুরু হয়।
মুখার্জি বাড়িতে আজও শাক্ত মতে দুর্গাপুজো হয়। ষষ্ঠীর সন্ধ্যা থেকে পুজোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সপ্তমীতে বেলি বরণ, দোলা আনা, ছাগ বলি এবং কুমারী পুজোর মতো বিভিন্ন আচার পালন করা হয়। সপ্তমীর পাশাপাশি অষ্টমীতেও নির্দিষ্ট রীতি মেনে ছাগ বলি হয়। নবমীর দিন মোষ বলির পাশাপাশি ভেড়া বলির প্রথাও রয়েছে। এছাড়া আখ, চালকুমড়ো-সহ বিভিন্ন সামগ্রী বলি দেওয়া হয় এখনও।
পুজোর চার দিন প্রতিদিন দেবীকে ভোগ ও নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। পাশাপাশি প্রতি বছরের মতো এবারও নরনারায়ণ সেবার আয়োজন করা হবে। পুজোর এই চার দিন পরিবারের মহিলাদের রান্নাবান্নার কাজ করতে হয় না। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন। বাড়ির সদস্যরা যেখানেই থাকুন না কেন, পুজোর সময় সকলেই ফিরে আসেন নিজেদের আদি বাড়িতে। পরিবারের মহিলারাও এই ক’দিন অন্য ঠাকুর দেখতে বাইরে যান না।
এই পুজোর সবচেয়ে আলোচিত রীতি নবমীর দিনের মোষ বলি। পরিবার সূত্রে জানা যায়, একসময় নবমীর দিনে দুটি মোষ বলি দেওয়া হতো। কিন্তু একবার পুজোর সময় নবমীর আগের দিন একটি মোষের গলায় দড়ির ফাঁস লেগে মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই দুটি মোষের পরিবর্তে একটি মোষ বলি দেওয়ার প্রথা চালু হয়।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, ব্রিটিশ আমলে এই বলি প্রথা বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ইংরেজ প্রশাসনের তরফে তৎকালীন জেলাশাসককে দিয়ে বলি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে তাঁদের বক্তব্য। তবে লোককথা অনুযায়ী, পরে সেই জেলাশাসক নিজেই পুজোর সময় এসে বলি চালু রাখার কথা বলেন। পরিবারের প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, তিনি জানিয়েছিলেন, রাতে ঘুম হচ্ছে না এবং বারবার দুঃস্বপ্ন দেখছেন। স্বপ্নে কেউ ত্রিশূল নিয়ে তাঁকে আক্রমণ করতে আসছে বলে মনে হচ্ছিল। এরপর থেকেই বলি বন্ধের সিদ্ধান্ত আর কার্যকর হয়নি বলে পরিবারের সদস্যদের দাবি।
একসময় মুখার্জি বাড়ির সদর দরজার উপরে নহবত বসত। বর্তমানে সেই জায়গা ফাঁকা থাকলেও পুজোর ঐতিহ্য আজও অমলিন। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের মানুষও এই পুজোয় অংশ নেন। বিশেষ করে নবমীর মোষ বলি দেখতে মন্দির চত্বরে মানুষের ভিড় জমে।
৩৩৪ বছরের প্রাচীন এই দুর্গাপুজো শুধু মুখার্জি পরিবারের ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং সোঁয়াই গ্রামের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং সামাজিক মিলনমেলারও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্যকে ঘিরেই আজও দুর্গোৎসবের চারটি দিন আনন্দে মেতে ওঠেন পরিবারের সদস্য ও গ্রামবাসীরা।