ওঙ্কার ডেস্ক: দুর্গাপুরে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রীর গনধর্ষণ মামলায় পাঁচ জন অভিযুক্তিকে গ্রেফতার করেছে দুর্গাপুর নিউটাউন থানার পুলিশ। সোমবার পঞ্চম অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনিই মূল অভিযুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে। শনিবার রাতেই তিন জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। রবিবার তাদের আদালতে পেশ করা হলে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয় আদালত। রবিবার রাতে আর একজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। নির্যাতিতার বয়ান অনুসারে পাঁচজন দুষ্কৃতি তাঁকে হেনস্থা করেছিল। অভিযুক্ত সকলেই এখন পুলিশের আওতায়। সোমবার প্রত্যেকেই দুর্গাপুর মহুকুমা আদালতে পেশ করা হবে।
প্রসঙ্গত, পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরে এক দ্বিতীয় বর্ষের এক চিকিৎসক ছাত্রীকে রাতে কলেজ ক্যাম্পাসের বাইরে থেকে অপহরণ করে নির্জন জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে একদল দুষ্কৃতী। নির্যাতিতার সঙ্গে থাকা এক সহপাঠীকেও ওই রাতে মারধর করা হয় বলে জানা গিয়েছে। তাঁর মোবাইল ফোন ছিনতাই করে মুক্তিপণ দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ।
দুর্গাপুরে মেডিক্যাল কলেজের ঐ ছাত্রী ওড়িশার জালেশ্বরের বাসিন্দা। পড়াশুনা সুত্রে তিনি পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরে থাকতেন। নির্যাতিতার বয়ান অনুযায়ী শুক্রবার রাত ৮ টা নাগাত ঘটনাটি ঘটে। তিনি জানান, কলেজে ফেরার পথে তিন জন দুষ্কৃতি নিকটবর্তী নেশার ঠেক থেকে তাদের দুইজনকে উত্যক্ত করতে থাকে। তারপর তাঁর সহপাঠী সেখান থেকে পালিয়ে গেলে ঐ তিনজন তরুনীকে পাশের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে। পরবর্তীতে আরও দুইজন তাঁকে হেনস্থা করে বলে জানান তিনি। পরে নির্যাতিতার সহপাঠী তাঁকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। নির্যাতিতার সহপাঠীকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে, যদিও তাঁর ভূমিকা এখনও স্পষ্ট নয়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তরুণীকে দুর্গাপুরের এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেও মানসিকভাবে তিনি ভীষণভাবে আঘাতপ্রাপ্ত। পুলিশ ইতিমধ্যেই তাঁর বয়ান রেকর্ড করেছে। নির্যাতিতার বাবার বক্তব্য, মেয়ে এখন হাঁটতে পারছেন না, বিছানাতেই শুয়ে রয়েছেন। তিনি জানান, “আমার মেয়ের নিরাপত্তা এখন পশ্চিমবঙ্গে নেই। আমরা ওড়িশার মানুষ, তাই মেয়েকে নিজের রাজ্যে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাতে চাই।” সেই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে মেয়েকে নিরাপদে ওড়িশায় স্থানান্তরের অনুমতি চেয়েছেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক। দোষীদের ছাড় দেওয়া হবে না। তবে মেয়েদেরও রাতের বেলা বাইরে না বেরনো উচিত। কলেজগুলোকেও নজরদারি বাড়াতে হবে।” তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে প্রবল বিতর্ক। বিরোধীরা অভিযোগ তুলেছে, মুখ্যমন্ত্রী আসলে মেয়েদেরই দোষারোপ করছেন। বিজেপির দাবি, “পশ্চিমবঙ্গ এখন ধর্ষকদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছে।” উত্তরবঙ্গ সফরে আছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সেখান থেকে তিনি জানান তাঁর মন্তব্যকে বিকৃত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরন মাঝি এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। চিকিৎসক মহল থেকেও ক্ষোভের সুর উঠেছে। বিভিন্ন মেডিক্যাল সংগঠন অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি ওড়িশা থেকে একজন মহিলা প্রতিনিধি দুর্গাপুরে পাঠান। সুত্রের খবর অনুসারে ওড়িশা সরকারের মহিলা প্রতিনিধিকে নির্যাতিতার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এতেও ক্ষুব্ধ হন মুখ্যমন্ত্রী মাঝি।
দুর্গাপুরের বিধায়ক তথা জেলা সভাপতি নরেনন্দ্রনাথ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, “মলয় ঘটক এবং প্রদীপ মজুমদার নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে যগাযোগ রেখেছেন। অভিযুক্তরা গ্রেফতার হয়েছে। দোষীদের কঠোর শাস্তি হবে”। তৃণমুলের পাশাপাশি বিজেপিও সরব হয়েছে এই ঘটনায়। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সোমবার দুর্গাপুর যাবেন। নির্যাতিতার পরিবারে সঙ্গে দেখা করবেন তিনি। বিজেপি দুর্গাপুরে ধর্ণামঞ্চের আয়োজন করা হয়েছে। সেই ধর্নামঞ্চের নেতৃত্ব দেবেন শুভেন্দু, বলে জানা গিয়েছে।
গত বছর ৯ আগস্ট কলকাতার আরজিকর মেডিক্যাল কলেজে এক জুনিয়র ডাক্তারকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল। সেই ঘটনায় রাজ্য রাজনীতি তোলপাড় হয়েছিল। এই ঘটনা সামনে আসতেই সরব হয়েছেন তিলত্তমার বাবা মা। মেয়েদের রাত্রে বাইরে বেরানো নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁদের কথায়, “ধর্ষক, অপরাধীদের মাথায় তৃণমুল প্রশাসনের হাত আছে। নির্যাতিতারা ন্যায় পায়না, আর এটাই হয়ে আসছে”। তিলোত্তমার বাবা মা মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তোলেন।
দুর্গাপুরের এই নৃশংস ঘটনার পর সমাজের সব স্তরে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। রাজ্যের মহিলা কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, দোষীদের কোনওভাবেই রেহাই দেওয়া হবে না। তবে তাঁর মন্তব্য ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা রাজ্য রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ যোগ করেছে। এখন নজর আদালতের বিচারের দিকে।
