অর্ণব দত্ত
ভারত কৃষিপ্রধান দেশ। কৃষিক্ষেত্রে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন নারী ও পুরুষ দুতরফই। কৃষিশ্রমিক হিসেবে কর্মজীবীদের মধ্যে অধিকাংশ মহিলা। পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে অনুসারে, কৃষিক্ষেত্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ মহিলা। এক্ষেত্রে আনুপাতিক হারে পুরুষের সংখ্যা তুলনায় কম। ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৪০ দশমিক ২ শতাংশ।
কৃষিক্ষেত্রে যে সমস্ত নারী-পুরুষ কাজ করেন, তাদের অনেকেই গুরুতর স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন বলে সমীক্ষায় জানা গিয়েছে। এখন দেখা যাক, সমস্যা কোন কোন প্রকারের। ইরশাদ কুরেশি এবং আশুতোষ বাগদে নামে দুই সমীক্ষক ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে ভারতে কৃষিক্ষেত্রে কর্মরতদের স্বাস্থ্যঘটিত সমস্যা সংক্রান্ত একটি পেপার প্রকাশ করেছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, আতিরিক্ত খাটুনির চাপে কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে অনেকে পেশী এবং হাড়ের যন্ত্রণায় ভুগছেন। এবাদে পিঠে এং ঘাড়ে তীব্র ব্যথা, হাঁটুর ব্যথা, স্নায়ুরোগ-সহ নানা ধরনের অসুখবিসুখে জর্জরিত ওঁরা। তবুও ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড চাষবাস। ভারতের গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা কোটি কোটি প্রবীণ নাগরিক নারী-পুরুষ কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন অসুস্থতা সত্ত্বেও। কারণ ভাত বড় বালাই।
ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালের তরফে দুই গবেষক সমীক্ষা চালিয়েছেন এদেশের গ্রাম পঞ্চায়েতগুলির বাসিন্দা অন্তত ৩০ হাজার নারী-পুরুষ কৃষিশ্রমিকের উপর। দেখা যাচ্ছে, ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক নারী-পুরুষ পেটের দায়ে কৃষিক্ষেত্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন বহু আদিবাসী। পেশাজনিত অসুখে প্রবীণ নাগরিক কৃষকদের অসুস্থতার হার সামাজিক দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে গত কয়েক দশক ধরে।
শুধুমাত্র ভারত নয়, সাতটি মহাদেশের মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন দেশগুলিতে কৃষিজাত সামগ্রী উৎপাদনের হার সবচেয়ে বেশি। ভারতে কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত, বিশেষত প্রবীণ নাগরিকরা নানা ধরনের অসুখে আক্রান্ত হলেও চিকিৎসা মোটেও মিলছে না। কেননা ডাক্তারের অভাব। একইসঙ্গে অভাব সচেতনতামূলক প্রচারের।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা অবিলম্বে্ জরুরি। কেননা ভারতে কৃষিশ্রমিক হিসেবে কর্মরতদের বৃহৎ একটি অংশের বয়স ১৮ বছর কিংবা তার চেয়ে বেশি। সুতরাং ভবিষ্যতে কৃষিশ্রমিকদের যাতে এধরনের রোগব্যাধি থেকে রক্ষা করা যায়, সেব্যাপারে সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করা কর্তব্য। এজন্য কেবল সরকার নয়, এগিয়ে আসতে হবে স্বেচ্ছাসেবীদেরও।

ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে জনস্বাস্থ্যঘটিত এই বিপদের নামকরণ করা হয়েছে, মাস্কুলোস্কেলিটাল ডিজঅডার্স। সার সংক্ষেপে এমএসডিএস। আরেকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হল এই যে, শ্রমজীবী কৃষক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি হোয়াইট কলার ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরতদের একাংশও এমএসডিএসে আক্রান্ত। আক্রান্তের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরতদের মধ্যে পিঠের বেদনা থেকে শুরু করে কাঁধে ব্যথা, এবাদে হাত এবং কবজিতে তীব্র ব্যথা হচ্ছে। এই সমস্যা সম্পর্কে গবেষকরা জানিয়েছেন, একটানা চেয়ারে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজের দরুণ, বিশ্রামের অবকাশ না মেলায় এই সমস্যায় আক্রান্ত তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্রে কর্মরতদের অনেকেই। যার মধ্যে নারী-পুরুষ দুতরফই রয়েছেন।
ইন্ডিয়ান জার্নাল অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকরা জানাচ্ছেন, করোনা পরিস্থিতির পর থেকে সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দক্ষিণ ভারতে কর্মরত ৩৪ শতাংশের বেশি তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী জানিয়েছেন, তাঁদের ঘাড়ে তীব্র যন্ত্রণা হচ্ছে, এছাড়াও পিঠের উপরের এবং তলার অংশের ব্যথায় ভুগছেন যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে কর্মরতরা।
সারা বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি কম্পানিগুলি ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই করছে। ফলে যাঁদের চাকরি টিকে আছে, তাঁদের উপর কাজের চাপ মাত্রাতিরিক্ত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চেয়ারে একটানা বসে ৯ ঘণ্টা থেকে টানা ১০ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে ওঁদের।
এর বাইরে পরিবহন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের অনেকে, জঞ্জাল সাফাইয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মী এবং গুদামগুলিতে অবিরাম ঘাম ঝরানো কর্মীদের মধ্যে অনেকেই মাস্কুলোস্কেলিটন ডিসঅর্ডার্সে আক্রান্ত। এদিকে আক্রান্তদের অধিকাংশের চিকিৎসা করানোর মতো আর্থিক সামর্থ্য পর্যন্ত নেই।