নিজস্ব প্রতিবেদন, গঙ্গারামপুর: রাত পোহালে বিশ্বকর্মা পুজো। একসময় এই পুজোকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজে মেতে উঠত গঙ্গারামপুরের তাঁতপাড়া। এই সময় থেকেই শুরু হত দুর্গাপুজোর ব্যস্ততা। সকাল থেকে গভীর রাত, কখনও ভোর পর্যন্ত চলত তাঁত কলের খটাখট শব্দ। পুজোর মরশুমে চাহিদা মেটাতে নাওয়া-খাওয়া ভুলে শাড়ি বুনতেন কারিগররা। ভাদ্র সংক্রান্তির বিশ্বকর্মা পুজো থেকে দুর্গাপুজো—এই কয়েকটা মাস ছিল তাঁতিদের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। কিন্তু কালের নিয়মে সেই দিন এখন আর নেই। সময়ের সঙ্গে থমকে গিয়েছে অধিকাংশ তাঁত। বদলে গিয়েছে বিশ্বকর্মা পুজোর ছবিও।
দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরের ঠেঙাপাড়া এলাকা একসময় ছিল জমজমাট তাঁতপাড়া। ওপার বাংলা থেকে আসা তাঁতশিল্পীদের হাত ধরে এই এলাকায় গড়ে উঠেছিল তাঁতশিল্পের বড় পরিসর। স্থানীয়দের দাবি, একটা সময় প্রায় হাজার বাড়িতে চলত তাঁত বুননের কাজ। প্রতিটি ঘরেই বিশ্বকর্মা পুজো ঘিরে থাকত আলাদা উন্মাদনা। পুজোর প্রায় এক মাস আগে থেকেই তাঁত ঘরের একটি নির্দিষ্ট জায়গা পরিষ্কার করে পুজোর জন্য প্রস্তুত করে রাখতেন কারিগররা। বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সকালে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হত তাঁতযন্ত্র। মাকু, চরকা-সহ তাঁত বোনার যাবতীয় সরঞ্জামও সাজিয়ে রাখা হত দেবশিল্পীর সামনে। তাঁদের কাছে এই যন্ত্রগুলিই ছিল সংসার চালানোর প্রধান অবলম্বন। তাই পুজোর দিনে কাজ বন্ধ রেখে সেই যন্ত্রপাতিরই আরাধনা করতেন কারিগররা। পাড়াজুড়ে চলত উৎসবের আমেজ।
কিন্তু আজ সেই ছবিতে বড়সড় বদল। তাঁতের শাড়ির বাজারে মন্দা, সুতোর অস্বাভাবিক দাম, পাওয়ারলুমের দাপট এবং পরিশ্রমের তুলনায় কম পারিশ্রমিক—সব মিলিয়ে একের পর এক সমস্যায় জর্জরিত তাঁতশিল্পরা। স্থানীয়দের দাবি, ঠেঙাপাড়ার প্রায় ৯০ শতাংশ তাঁতই এখন বন্ধ। একসময় যে হাতে শাড়ি বোনা হত, সেই হাতই এখন অন্য পেশায় ব্যস্ত। কেউ টোটো চালাচ্ছেন, কেউ ছোট দোকান খুলেছেন। অনেকে আবার সংসার চালাতে পাড়ি দিয়েছেন ভিন্রাজ্যে। ফলে বিশ্বকর্মা পুজোর আগে যে ঠেঙাপাড়ায় তাঁতের শব্দে কান পাতা দায় ছিল, সেখানে এখন অনেকটাই নীরবতা।
তাঁতশিল্পীদের দুর্দশা কাটাতে গঙ্গারামপুরে তন্তুজের অফিস তৈরি হলেও তাতে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয় কারিগরদের। তাঁদের দাবি, বাজার, কাঁচামাল এবং ন্যায্য দামের সমস্যা মেটানো না গেলে এই শিল্পকে ফেরানো কঠিন। তবে শিল্পের অবস্থা যতই করুণ হোক, বিশ্বকর্মার আরাধনায় এখনও ছেদ পড়েনি। যে সব ঘরে তাঁত চলছে, সেখানে কম আড়ম্বর হলেও পুজোর আয়োজন হচ্ছে। আর যেসব তাঁত চিরতরে থেমে গিয়েছে, সেখানেও অনেক পরিবার ঘট বসিয়ে পালন করছে বিশ্বকর্মা পুজো। সাধ্যমতো নতুন পোশাক, ভালো-মন্দ খাবারের আয়োজনও থাকছে। রুগ্ন শিল্পের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বিশ্বকর্মা পুজোকে আঁকড়ে ধরে পুরনো ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন গঙ্গারামপুরের অবশিষ্ট তাঁতিরা।