অর্ণব দত্ত
জেন আলফা বলতে বোঝায় এক থেকে ১৬ বছর পর্যন্ত শিশু কিংবা কিশোর-কিশোরীদের। এদের একাংশ আজ মনোবিকারের শিকার। সমীক্ষায় জানা গিয়েছে,. ভারতে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ২৩ শতাংশ হতাশা, উদ্বেগ কিংবা পঠনপাঠনজনিত চাপের শিকার।
অনেকক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে. এজন্যে দায়ী বাবা-মা। বাবা-মায়েরা মনে করছেন, সন্তান যেন প্রতিযোগিতার বাজারে এগিয়ে থাকে। এর জেরেও শিশু এবং কিশোর-কিশোরীরা মনোবিকারে আক্রান্ত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওঁদের আচরণগত সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।
ভারতে ২০২৭ সালের জনগণনার পরে জানা যাবে, এখন সারা দেশের লোকসংখ্যা কত। সমীক্ষা অনুসারে, ভারতে লোকসংখ্যা ২০১১ সালের সেনসাস অনুসারে সবচেয়ে বেশি। এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান মনে বলে মনে করছে রাষ্ট্রসঙ্ঘ।
ইউনিসিফের সমীক্ষা অনুসারে, নাবালক কিংবা নাবালিকারা মনোবিকারের শিকার হলেও তা তাদের অভিভাবকদের জানাচ্ছে না ওরা। এদিকে সারা বিশ্বের ১০ শতাংশ শিশু কিংবা কিশোর-কিশোরী মনোবিকারের শিকার বলে ইউনিসেফ জানাচ্ছে। ওয়ার্ডস চিলড্রেন রিপোর্টস অনুসারে, সারা বিশ্বে ১০ শতাংশ শিশু কিংবা কিশোর-কিশোরী নানা ধরনের মানসিক সমস্যার শিকার। এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়ার অন্তর্গত দেশগুলিতে। যার মধ্যে অন্যতম ভারত।
কীভাবে এই সমস্যার মোকাবিলা করা যায়, সেব্যাপারে পথনির্দেশ করেছেন মনোবিদরা। যেমন, বাবা-মাকে শিশুর ভবিষ্যতের শিক্ষা এবং দিশা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। এবাদে সমাজকেও সচেতন হতে হবে, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম নাগরিক হিসেবে সুস্থ মানসিকতার অধিকারী হয়।
কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের পেশ করা তথ্যানুসারে, ২০২৫-২০২৬ সালের নিরিখে ভারতে স্কুল ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২৪ কোটি ৭২ লক্ষ। আর শিক্ষক-শিক্ষিকার সংখ্যা ১ কোটির চেয়ে সামান্য কিছু সংখ্যক বেশি। ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেম এডুকেশন সিস্টেম প্লাসের হিসেবে, বর্তমানে ভারতে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রছাত্রীর আনুপাতিক হার সমান-সমান। এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে নারীশিক্ষা বিকাশে দীর্ঘ আন্দোলনের জেরে। যার সূত্রপাত ব্রিটিশ আমলে মহারাষ্ট্রে সাবিত্রীবাঈ ফুলে এবং তাঁর স্বামী জ্যেতিরাও ফুলের মাধ্যমে। পুনেতে প্রথম মেয়েদের জন্যে স্কুল তৈরির করার দরুণ সাবিত্রীবাঈ ফুলে সেসময় সমাজপতিদের হাতে কেবল মানসিক নিগ্রহ নয়, শারীরিক নিগ্রহেরও শিকার হন।
সাবিত্রীবাঈ ফুলে ছিলেন অবিভক্ত ভারতের প্রথম মহিলা শিক্ষিকা। ১৮৩১ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ছিল ওঁর আয়ুষ্কাল। সাবিত্রীফুলের মতো তাঁর স্বামী জ্যোতিরাও ফুলে নারীশিক্ষার প্রসার ঘটাতে গিয়ে একইভাবে সেসময় সমাজপতিদের হাতে নিগৃহীত হন|। এমনকি সামাজিকভাবে ওঁদের একঘরে করেও রাখা হয়।
বাংলায় নারীশিক্ষার পথিকৃৎ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫৭ সাল থেকে ১৮৫৮ সালের মধ্যে অবিভক্ত বাংলার হুগলি, নদিয়া, মেদিনীপুর এবং বর্ধমানে অন্তত ৩৫টি থেকে ৪০টি নাবালিকা বিদ্যালয় তৈরি করেন। নারীশিক্ষার প্রবর্তক হিসেবে বিদ্যাসাগরকেও একইভাবে নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছিল, একথা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
যাইহোক, আজকের দুনিয়ায় পৃথিবীর দুটি দেশে শিশু এবং কৈশোর মানসিকভাবে পুরোপুরিভাবে সুরক্ষিত। দেশটির নাম নেদারল্যান্ডস। এই দেশে শৈশব, কৈশোরকে গ্রোগ্রাসে সিলেবাস মুখস্থ করতে হয় না। এদের বাবা-মায়ের সঙ্গে শিশুর আত্মিক সম্পর্ক যেন মজবুত হয়, সেব্যাপারে সজাগ সরকার। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের মানসিক উন্নতির বিকাশের বিশ্বের দ্বিতীয় স্থানাধিকারী দেশ ডেনমার্ক।
ইউনিসেফের মতে, জীবন তৈরির কারিগর শিক্ষা। তবে তা এমন উপায়ে হওয়া উচিত যাতে শৈশব, কৈশোর মাত্রাতিরিক্ত চাপে দিশাহারা না হয়। স্বাধীনতার ৮০ বছর পেরিয়ে ভারতকে এই পথের অনুসারী হতে হবে বলেই বলে মনে করেন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন শিক্ষাবিদরা। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে দিল্লি বহুত দূর।
ভারতে নাবালক-নাবালিকা ছাত্রছাত্রীদের মানসিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নানা বেসরকারি সংস্থার সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, নাবালকদের তুলনায় নাবালিকারাই নানা ধরনের উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত। তবে নাবালকরাও আক্রান্ত সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত আসক্তির দরুণ। এর ফলে ব্যবহারজনিত অস্বাভাবিকতা দেখা দিচ্ছে।
এও ভাববার কথা। সময় এসেছে জেন আলফার মন ও মানসিকতার পরিবর্তনের। আর এর দায় কেবল সরকারের নয়, বরং গোটা সমাজের। কেননা শিক্ষার শুরুয়াত হয় পরিবারের অন্দরেই।