মৌসুমী পাল : চিনের মতিগতিতে পুরোপুরি মেঘ কাটল না দিল্লির। সোমবার ভারত সফরে এসেছিলেন চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই। নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের সঙ্গে টানা দুই দিনের বৈঠকের পর সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। সীমান্ত সমস্যার সমাধান, সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা, তীর্থযাত্রা ও সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালুর মতো নানা উদ্যোগে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছিল দিল্লি। কিন্তু দিল্লি থেকে চিনের বিদেশমন্ত্রীর পাকিস্তান যাওয়াকে ভালো চোখে দেখছে না ভারত।
দিল্লিতে বৈঠক শেষ করেই চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই গেলেন ইসলামাবাদে। সেখানে শুরু হয়েছে ষষ্ঠ ‘পাকিস্তান-চিন ফরেন মিনিস্টারস্ স্ট্রাটেজিক ডায়ালগ’, যা চলবে ২০ থেকে ২২ অগস্ট পর্যন্ত। ইসলামাবাদে পৌঁছে পাকিস্তানের সঙ্গে “অল ওয়েদার” কৌশলগত সম্পর্ক মজবুত করার সংকেত এই দ্বিমুখী সফর আসলে বেজিং-এর এক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশল। যা সম্ভবত মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে উঠেছে নয়া দিল্লির।
ভারতের ক্ষেত্রে চিন বিদেশ মন্ত্রকের সঙ্গে বৈঠকটি ছিল আস্থা ফিরিয়ে আনার এক প্রচেষ্টা। গালওয়ান সংঘর্ষ-পরবর্তী অচলাবস্থায় সীমান্ত এলাকায় স্থিতিশীলতা আনার প্রয়াস এবং ২০০৫ সালের সীমান্ত চুক্তির ভিত্তিতে ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত সমাধানের খসড়া তৈরির ঘোষণা ছিল মূল বার্তা। তাছাড়া কৈলাস মানস সরোবর যাত্রার প্রসার, সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু এবং সরাসরি বিমান পরিষেবা শুরুর মতো সিদ্ধান্তকে নয়াদিল্লি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ও ওয়াং ই-এর বক্তব্যেও এই আস্থার প্রতিফলন ছিল। তবে কূটনীতিতে প্রতিটি বার্তার পিছনে লুকিয়ে থাকে আরেকটি অন্তর্নিহিত বার্তা। নয়াদিল্লি থেকে বেরিয়ে ইসলামাবাদে গিয়ে ওয়াং ই যে বার্তা দিলেন, তা স্পষ্ট, চিন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সমানতালে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
পাকিস্তানের বিদেশ দফতরের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওয়াং ই পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও বিদেশমন্ত্রী সেনেটর মোহাম্মদ ইশাক দারের আমন্ত্রণে ইসলামাবাদ সফরে গিয়েছেন। বৈঠকে দুই দেশ পারস্পরিক মূল স্বার্থে পুনরায় সমর্থন জানাবে, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা জোরদার করবে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি পুনর্নবীকরণ করবে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়ে এই সফর ইসলামাবাদের কাছে একপ্রকার ভরসার প্রতীক। মুদ্রাস্ফীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ঋণনির্ভর অর্থনীতির চাপে বিপর্যস্ত পাকিস্তান ওয়াং ই-এর সফরকে চিনের পাশে থাকার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বেজিং দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত সমস্যা সমাধান ও আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজন রয়েছে বেজিং-এর জন্য, কারণ অর্থনৈতিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ভারতের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে পাকিস্তান চিনের কৌশলগত মিত্র, বিশেষত সামরিক সহযোগিতা ও চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের (CPEC) কারণে। আবার অন্য ভাবে বলতে গেলে, সম্প্রতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি পাকিস্তানকে খোলা সমর্থন করেছে পাশাপাশি ভারত বিরোধী পদক্ষেপও নিয়েছে। বেজিং-এর কাছে এই বিষয়টি ষ্পষ্ট যে পাকিস্তানকে হাতে রেখে উপমহাদেশে আধিপত্য বিস্তারের জন্যই ট্রাম্পের এই কৌশল। পাকিস্তানকে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের ভরসায় ফেলে রাখলে ভবিষ্যতে তা পাল্টা আঘাত হানবে চিনের উপরেই। তাই ইসলামাবাদকে হাতছাড়া করা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না বেজিং-এর। ফলে নয়াদিল্লি সফরের সঙ্গে সঙ্গেই ইসলামাবাদে যাওয়া আসলে সেই নীতিরই প্রতিফলন।
চিনের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মাও নিং সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, “ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই চিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। চিন উভয়ের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইচ্ছুক।” এই বক্তব্য একদিকে নিরপেক্ষ শোনালেও, অন্যদিকে এটি পাকিস্তানের প্রতি আশ্বাসের বার্তাও। তাই চিন সম্ভবত এটা স্পষ্ট করে দিতে চাইছে, নয়াদিল্লির সঙ্গে উষ্ণ আলোচনা হলেও ইসলামাবাদকে ভুলে যায়নি বেজিং। ওয়াং ই-র এই সফর থেকে দুইটি বিষয় পরিষ্কার হচ্ছে। প্রথমত, ভারত-চিন সম্পর্কের মধ্যে গালওয়ান সংঘর্ষ-পরবর্তী যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা গলছে এবং দুই দেশ বাস্তবসম্মত সমাধানের পথে এগোচ্ছে। দ্বিতীয়ত, বেজিং পাকিস্তানের সঙ্গে তার পুরোনো কৌশলগত বন্ধনকে অটুট রাখতে চাইছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তা প্রকাশ করতেও দ্বিধা করছে না।
ফলে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মানচিত্রে আগামী দিনে একটি জটিল সমীকরণ তৈরি হতে পারে। একদিকে ভারত-চিন সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা, অন্যদিকে একইসঙ্গে পাকিস্তানের সঙ্গে বেজিং-এর ক্রমবর্ধমান সামরিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দ্বৈত নীতি ভারতের জন্য যেমন সতর্কবার্তা, তেমনি পাকিস্তানের জন্য ভরসার প্রতীক। দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে এই ত্রিপাক্ষিক ভারসাম্যই আগামী দিনের ইস্যু হতে পারে। তা যদি হয়, তাহলে কি বিশ্ব শক্তি ভবিষ্যতে পূর্ব ও পশ্চিমে বিভক্ত হচ্ছে ? ট্রাম্পের টারিফ নীতিই কী অবশেষে বিশ্ব বাঁটোয়ারার কারণ হয়ে দাঁড়াতে চলেছে !
