ওঙ্কার ডেস্ক: সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক এমন এক তপ্ত বিন্দুতে পৌঁছেছে, যা শুধুমাত্র দ্বিপাক্ষিক বিরোধের বিষয় নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিকে বড়সড় মোড় ঘোরানোর সম্ভাবনা রাখে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ও কূটনীতিকদের একাংশের মতে, এই উত্তেজনার পিছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল যা পাকিস্তানকে হাতের মুঠোয় রেখে এবং ভারতকে চাপের মুখে ফেলে উপমহাদেশে তাদের কৌশলগত ঘাঁটি দৃঢ় করা।আমেরিকার চূড়ান্ত লক্ষ্য, রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়াকে নতুন ‘ফ্রন্টলাইন’ বানানো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান বরাবরই ‘লেনদেনভিত্তিক’। এই নীতি অনুসারে, পাকিস্তানকে দেওয়া হচ্ছে বিপুল অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা, সন্ত্রাস দমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার নামে। মার্কিন প্রশাসন একদিকে ইসলামাবাদে কোটি কোটি ডলারের অনুদান পাঠাচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার জন্য পাক সেনাকে সবুজ সংকেত দিচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে এমন অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শান্তিরক্ষক’ বা ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে প্রবেশের অজুহাত দেবে। এর মাধ্যমে তারা ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের উপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দিতে পারবে।
সিন্ধু জল চুক্তি বর্তমানে এই সংঘাতের কেন্দ্রে। ৬৫ বছরের পুরনো চুক্তিটি নয়াদিল্লি স্থগিত করতেই ইসলামাবাদের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির পর্যন্ত সরাসরি পারমানবিক হুমকি দিতে শুরু করেছেন ভারতকে। তাঁর বক্তব্য, ভারত যদি সিন্ধুর জল আটকে রাখে, তবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে বাঁধ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এমন স্পষ্ট যুদ্ধোত্তেজক বার্তা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নীতিতে যেমন প্রভাব ফেলছে, তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ‘সুবর্ণ সুযোগ’ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ভারতকে অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে তুলে ধরে এবং পাকিস্তানকে প্রতিরক্ষাকারী দেশ হিসেবে গোটা বিশ্বের সামনে হাজির করা। আমেরিকার এই চালকে আর এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তোষামোদ করে ট্রাম্পকে শান্তির প্রতীক হিসাবে তুলে ধরেছেন স্ব-ঘোষিত ফিল্ড মার্শাল আসীম মুনির। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য নোবেল শান্তি পুরষ্কারের দাবিও তোলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা এখানে দ্বিমুখী। একদিকে তারা ভারত-পাক উত্তেজনা বাড়িয়ে এই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বৈধতা দিতে চাইছে, অন্যদিকে সেই উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে রাশিয়া ও চীনের মত আমেরিকা বিরোধী দেশ গুলির বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত ঘেরাটোপ তৈরি করছে। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে পা বসানোর জন্য তারা বহুদিন ধরেই একটি ‘প্রক্সি সংঘাত’-এর সুযোগ খুঁজছিল। সিন্ধু জল চুক্তি সেই সম্ভাব্য ‘ফ্ল্যাশপয়েন্ট’ হিসেবে উঠে এসেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বানিজ্য ক্ষোভও এই অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে। কৃষি, দুগ্ধজাত পণ্য ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বাজার খুলে দিতে ভারত রাজি না হওয়ায়, এবং পাশাপাশি রাশিয়া থেকে সস্তায় খনিজ তেল কেনা অব্যাহত রাখায়, ওয়াশিংটন সরাসরি ভারতকে বাণিজ্যিক শাস্তি দিয়েছে। এক মাসের ভিতর ভারতীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানো হয়েছে, আবার ভবিষ্যতে শুল্কের পরিমান আরও বাড়ানোর হুমকি তো আছেই ট্রাম্পের মুখে। অপরদিকে পাকিস্তানের উপর ১৯ শতাংশ বানিজ্যক শুল্ক ধার্য করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এতেই থেমে থাকেননি ট্রাম্প, পাকিস্তানের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি করে ট্রাম্প প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, ইসলামাবাদের তেল সম্পদে বিনিয়োগ করবে যুক্তরাষ্ট্র।সেই সঙ্গে ভারতকে উস্কানি দিয়ে বলেছেন হয়ত সদূর ভবিষ্যতে ভারত তার পশ্চিম প্রতিবেশি থেকেই তেল আমাদানি করবে। এই বার্তাকে অনেকেই ভারতের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের অংশ হিসেবেই দেখছেন।
এদিকে, মার্কিন সমর্থন কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন ‘আর্মি রকেট ফোর্স’ গঠনের কথা, যা বিশ্লেষকদের মতে সরাসরি ভারতকে লক্ষ্য করে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রশিল্পও বিপুল লাভবান হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় অস্ত্র বিক্রির বাজার উন্মুক্ত হবে আমেরিকার জন্য, যা ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক মুনাফাও নিশ্চিত করবে প্রাচ্যের দেশের।
ভারতের প্রতিরক্ষা মহল এই পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখছে না। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, পাকিস্তানের কোনও দুঃসাহসিক পদক্ষেপের পরিণতি যন্ত্রণাদায়ক হবে। সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীও ইঙ্গিত দিয়েছেন, পরবর্তী যুদ্ধ হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই ঘটতে পারে এবং সেখানে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে, সিন্ধু জল চুক্তিকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই অস্থিরতা কেবল ভারত-পাক দ্বন্দ্ব নয় এটি হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন করে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। যুদ্ধ বাধলে শুধু দুই দেশ নয়, গোটা উপমহাদেশ এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হবে, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে নিজেদের ঘাঁটি গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। আর এই পথ তৈরি হচ্ছে এক প্রাচীন জল চুক্তির ভাঙন দিয়ে, যার ঢেউ উপমহাদেশ পেরিয়ে বিশ্ব কূটনীতিতে আছড়ে পড়বে এটা নিশ্চিত।
