রজত ভট্টাচার্য
ভারত ঘুরে গেলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনন। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্যিক জোট, প্রতিরক্ষার হাত ধরাধরি—সবকিছু মিলেমিশে যেন আবার পুরোনো দিনের উষ্ণতা ফিরে এসেছে। কিন্তু রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা—এসব তো সময়ের সঙ্গে বদলায়। যা বদলায় না, তা হলো মানুষের মন, মানুষের অনুভূতি।
ভারত আর রাশিয়ার সেই মন–ম্যাটির বন্ধন তৈরি হয়েছিল বহু আগে—যখন রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, সিনেমার আলো–ছায়ায় এক দেশ অন্য দেশের সঙ্গে হাত ধরেছিল। ’৫০ এর দশক থেকে ’৮০ এর দশক পর্যন্ত এই দুই দেশের মধ্যে যে সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছিল, তার রক্তক্ষরণ আজও শুকায়নি।
সেই সেতুবন্ধনের প্রথম স্তম্ভ—রাজ কাপুর
“আওয়ারা” মুক্তি পাওয়ার পর রাশিয়ায় যা ঘটেছিল, তাকে শুধু সাংস্কৃতিক আলোড়ন বললে কম বলা হবে—এটা ছিল এক প্রজন্মের প্রেম। রাশিয়ান তরুণীরা রাস্তায় রাস্তায় “আওয়ারা হুঁ…” গান গাইত, রাজ কাপুর ছিলেন যেন তাদের কিংবদন্তি। ছবিটি শুধুমাত্র ভারতীয় সিনেমা নয়, সোভিয়েত সমাজতন্ত্রী মানসিকতাকেও নাড়া দিয়েছিল। দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম, বঞ্চনার বিরুদ্ধে লড়াই—রাশিয়া সেই গল্পে নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখতে পেত।
সেই ধারাবাহিকতায় এলেন আরেক বাঙালি রত্ন—মিঠুন চক্রবর্তী
“ডিস্কো ড্যান্সার”—এই একটি সিনেমা রাশিয়ায় ঝড় তুলেছিল। রাশিয়ার টিভিতে যখন ছবির গান বাজত—“আই অ্যাম এ ডিস্কো ড্যান্সার”—তখন শহরের রাস্তায়, তুষারঢাকা চত্বরে, কলেজের করিডোরে—সবখানে নেচে উঠত তরুণ–তরুণী। আজও বহু রাশিয়ান বয়স্ক মানুষ বাংলার এই ছেলেটাকে “ইন্ডিয়ান এলভিস” বলে ডাকেন।
সিনেমা এমনই শক্তিশালী যে সীমান্ত ভেঙে ভালোবাসাকে রাষ্ট্রনীতির থেকেও বড় করে তোলে। কিন্তু এ শুধু নাম–কথার গল্প নয়। ভারত–রাশিয়া একসঙ্গে বহু চলচ্চিত্র বানিয়েছে—যৌথ প্রযোজনা। অথচ আমাদের দেশের নতুন প্রজন্ম জানেই না এমন বিরল সহযোগিতার কথা !
কিছু উল্লেখযোগ্য ইন্দো–সোভিয়েত কো–প্রোডাকশন :
“পরদেশী” (১৯৫৭) : ভারতীয় পরিচালক খাজা আহমেদ আব্বাস ও রুশ পরিচালক ভ্লাদিমির কোরশ–সাবলিনের যৌথ সৃষ্টি। আফানেসি নিকিটিনের ভারত ভ্রমণকে কেন্দ্র করে তৈরি এক মহাকাব্যিক ছবি।
“আ জার্নি বেয়ন্ড থ্রি সী’জ” (১৯৫৭) : একই ভ্রমণ–বৃত্তান্তের রুশ সংস্করণ, যেখানে ভারতকে দেখানো হয়েছে শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও রঙিন রহস্যে।
“আলিবাবা আউর ৪০ চোর” (১৯৭৯) : ভারত–উজবেক–রাশিয়ার যৌথ প্রযোজনা। মিঠুন, হেমা মালিনী, জিনাত আমান—এ ছবিটি সোভিয়েত ইউনিয়নে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছিল।
“শিকারী” (১৯৮১) : ভারত–সোভিয়েত যৌথ প্রযোজনা, যেখানে রাশিয়ান লোকেশন, রাশিয়ান টেকনিশিয়ান আর ভারতীয় গল্প মিলেমিশে এক দারুণ অভিযানের ছবি তৈরি করে।
এই সব চলচ্চিত্র কেবলই শিল্প নয়, এগুলো ছিল দুই দেশের হৃদয়ের সেতু, যেখানে সংস্কৃতি, সহযোগিতা, বন্ধুত্ব এক বিশাল সুরের মতো উচ্চারিত হয়েছে। রাশিয়ার মানুষের কাছে ভারতীয় সিনেমা শুধুই বিনোদন ছিল না, এ ছিল আবেগের আলপনা। তাদের চোখে ভারত মানে ছিল মানবিকতা, সরলতা, লড়াই, প্রেম, নাচ, গান, আর এক ধরনের অদ্ভুত জীবনের উষ্ণতা। আর ভারতের মানুষের কাছে রাশিয়া মানে—এক পুরনো বন্ধু, এক শক্ত প্রতিশ্রুতি, এক অটুট সম্পর্ক।
আজ যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি প্রতিনিয়ত নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, যখন দুনিয়া বিভক্তির পথে হাঁটছে, যখন দেশগুলো নিজেদের স্বার্থে একে অপরকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে; তখন ভালো লাগে ভেবে যে ভারত আর রাশিয়ার বন্ধুত্ব শুধু কূটনীতির টেবিলে নয়, সিনেমার আলোর ভিতরেও উজ্জ্বল।সেই আলোর পথ দেখিয়েছিলেন রাজ কাপুর, মিঠুন, হেমা মালিনী, বালরাজ সাহনি, নির্মাতারা, পরিচালকরা। তাদের প্রতিটি ফ্রেম যেন বলত— “বন্ধুত্ব কোনো চুক্তিপত্র নয়; এটা মানুষের ভালোবাসার চিরন্তন ভাষা।” পুতিন ভারত ঘুরে গেলেন, এটা রাজনৈতিক ঘটনা হতে পারে। কিন্তু আমাদের প্রজন্মের কাছে এটা মনে করিয়ে দেয়, ভারত–রাশিয়ার বন্ধুত্ব সিনেমার রিলের মধ্যেই প্রথম অমর হয়েছিল। শেষে একটা কথাই বলতে ইচ্ছে করছে, রাজনীতির রাস্তায় চুক্তি ভেঙে যেতে পারে কিন্তু শিল্পের রাস্তায় তৈরি হওয়া বন্ধুত্ব কোনোদিন ভাঙে না। কারণ সিনেমা সেই ভাষা, যা সব দেশের হৃদয়কে এক করে দেয়।
