ওঙ্কার ডেস্ক: ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বানিজ্য চুক্তির পর দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য মানচিত্রে নতুন প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গোপন বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশের অন্তরবর্তী সরকার। বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক কয়েক দিন আগে এই চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি ঘিরে দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল। দীর্ঘদিন ধরেই এই খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় ভরসা। কিন্তু সম্প্রতি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওইয়া বানিজ্য চুক্তির পর ভারতের উপর শুল্ক কমে ১৮% হওয়ার কথা জানানো হয়েছে মার্কিন প্রেসিদেন্টের তরফ থেকে। ভারতিয় রফতানিজাত দ্রব্যের উপর শুল্ক কমানোর ফলে ভারতীয় পণ্য আমেরিকার বাজারে তুলনামূলকভাবে কম দামে প্রবেশ করতে পারবে। আর এতেই বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আশঙ্কা, শুল্কের পার্থক্যের কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ভারতমুখী হলে বাংলাদেশের অর্ডার কমে যেতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত একটি সুবিধাজনক বাণিজ্য সমঝোতা চায় ঢাকা। জানা গেছে, আলোচনার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে চলছে। একটি নন-ডিসক্লোজার চুক্তির আওতায় হওয়ায় এখনও পর্যন্ত এই বাণিজ্য চুক্তির শর্তাবলি বা সম্ভাব্য শুল্ক হার জনসমক্ষে আনা হয়নি। সংসদ বা শিল্প মহলের সঙ্গেও বিস্তারিত আলোচনা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে ব্যবসায়ী সংগঠন ও শ্রমিক মহলে সংশয় তৈরি হয়েছে এই চুক্তি আদৌ দেশের স্বার্থে কতটা উপকারী হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানির প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশই তৈরি পোশাক শিল্প নির্ভর। এই খাতেই লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান। শুল্ক কিছুটা কমলেও তার প্রভাব সরাসরি পড়বে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ওপর। তাই শুল্ক সুবিধা না পেলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে, হঠাৎ করে চুক্তি সই হলে শ্রম আইন, পরিবেশ মানদণ্ড বা আমদানি নীতিতে অতিরিক্ত শর্ত আরোপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
রাজনৈতিক দিক থেকেও সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের ঠিক আগে এমন একটি বড় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ে দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, জনগণের সামনে চুক্তির শর্ত প্রকাশ না করে তড়িঘড়ি স্বাক্ষর গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী। তবে সরকারের বক্তব্য, দেশের রপ্তানি স্বার্থ রক্ষা এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি এবং সেটি করতেই অগ্রসর ইউনুস সরকার। তবে দেশের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মহল ইউনুস সরকারের এই প্রতিশ্রুতিতে ভরসা করতে পারেছে না বলেও জানা যাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতা এখন নতুন মোড় নিয়েছে। ভারত ইতিমধ্যেই শুল্ক সুবিধা পেয়ে এগিয়ে থাকায় বাংলাদেশও পিছিয়ে পড়তে চাইছে না। এই গোপন বাণিজ্য চুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা সুফল বয়ে আনবে, তা নির্ভর করছে এর শর্তাবলি এবং বাস্তবায়নের ওপর। দেশের শিল্প ও শ্রমজীবী মানুষের ভবিষ্যৎ অনেকটাই জড়িয়ে রয়েছে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে।
