ওঙ্কার ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–ইজরায়েল সংঘাত ঘিরে সামরিক উত্তেজনা ক্রমশ জটিল আকার নিচ্ছে। এই সংঘাতে এখন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক বিশেষ ‘মিসাইল অঙ্ক’ যেখানে তুলনা করা হচ্ছে ইরানের স্বল্পমূল্যের ড্রোন বনাম আমেরিকার অত্যাধুনিক ও ব্যয়বহুল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু শক্তির প্রদর্শন নয়, খরচের ভারসাম্যও বড় কৌশলগত বিষয় হয়ে উঠছে।
ইরান বিপুল সংখ্যায় স্বল্পমূল্যের ‘কামিকাজে’ বা আত্মঘাতী ড্রোন ব্যবহার করছে। এই ড্রোনগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল শাহেদ-১৩৬, যা তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং বড় পরিসরে উৎপাদনযোগ্য। একটি ড্রোন তৈরির খরচ আনুমানিক ২০ হাজার মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ড্রোনগুলো দূরপাল্লায় উড়ে গিয়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম এবং একসঙ্গে বহু ড্রোন পাঠিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলার কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই ড্রোন মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ব্যবহার করছে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘প্যাট্রিওট মিসাইল সিস্টেম’। এই ব্যবস্থার অন্তর্গত একটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের দাম প্রায় ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ একটি ২০ হাজার ডলারের ড্রোন ভূপাতিত করতে খরচ হচ্ছে কয়েক মিলিয়ন ডলার। এই বিপুল ব্যয়ের পার্থক্যই এখন সামরিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান এখানে ‘অ্যাট্রিশন স্ট্র্যাটেজি’ বা ক্ষয়যুদ্ধের কৌশল নিয়েছে। বিপুল সংখ্যায় সস্তা ড্রোন ছুড়ে দিয়ে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা মিসাইলের ভাণ্ডার দ্রুত ফুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যতই উন্নত হোক, তার উৎপাদন ও সরবরাহের একটি সীমা থাকে। একদিকে যেখানে ড্রোন দ্রুত ও তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি করা সম্ভব, অন্যদিকে প্রতিটি প্রতিরক্ষা মিসাইল তৈরি করতে সময়, প্রযুক্তি ও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে দীর্ঘমেয়াদে কোন পক্ষের রসদ আগে ফুরোবে? ইরানের ড্রোন ভাণ্ডার, নাকি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতিরক্ষা মিসাইল? সামরিক মহলের একাংশের মতে, যুদ্ধ এখন কেবল আঘাত ও পাল্টা আঘাতের লড়াই নয়, বরং অর্থনৈতিক সহনশীলতা ও শিল্পক্ষমতারও পরীক্ষা।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি, তেল পরিকাঠামো এবং কৌশলগত স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার আশঙ্কা বাড়ছে। প্রতিটি হামলার পর আকাশে সক্রিয় হচ্ছে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ছোঁড়া হচ্ছে একের পর এক ইন্টারসেপ্টর। তবে এই প্রতিরক্ষার খরচ দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়েই শুরু হয়েছে নতুন করে হিসাব-নিকাশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত ভবিষ্যতের যুদ্ধনীতির দিকনির্দেশও স্পষ্ট করছে। ব্যয়বহুল প্রচলিত অস্ত্রের বিরুদ্ধে সস্তা, প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যাপকভাবে উৎপাদনযোগ্য ড্রোন ব্যবহারের প্রবণতা বিশ্বজুড়ে বাড়তে পারে। ফলে সামরিক শক্তির সংজ্ঞা বদলে গিয়ে গুরুত্ব পেতে পারে সংখ্যার জোর ও খরচের ভারসাম্য।
