নিজস্ব সংবাদদাতা: ২৭শে মে, ১৯৯৭। ইসলামাবাদের আকাশে দুপুরবেলা পরপর কয়েকটি বিকট শব্দ। অনেকেই ভেবেছিলেন বোমা ফেটেছে। জানালার কাঁচ কেঁপে উঠেছিল বলে দাবি করেছিলেন কেউ কেউ। পাকিস্তান সরকার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, শব্দগুলো ভারতের একটি যুদ্ধবিমানের। মিগ-২৫। যদিও সেই দাবি কার্যত খারিজ করে দিয়েছিল ভারত। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের এক মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, “কোনও ভারতীয় সামরিক বিমান আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেনি।”
কিন্তু সেই ঘটনার প্রায় ২৮ বছর পর সত্যিটা প্রকাশ্যে এল। ভারতের তরফেই জানান হল, বিমানটি সীমান্ত পেরিয়েছিল। শুধু তাই না, আরও একগুচ্ছ চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করলেন ওই বিমানের পাইলটরাই।
ঘটনার কেন্দ্রে ছিল ভারতের হাতে থাকা সবচেয়ে রহস্যময় বিমান মিগ-২৫, ন্যাটো যার নাম দিয়েছিল ‘ফক্সব্যাট’। আমেরিকার কিংবদন্তি SR-71 ব্ল্যাকবার্ডের পাশাপাশি এটিই ছিল বিশ্বের একমাত্র বিমান যা নিয়মিতভাবে শব্দের তিন গুণ গতিতে উড়তে পারত। সেই সময় ভারতের কাছে ছিল মাত্র ১০টি মিগ-২৫। এর মধ্যে ৮টি সিঙ্গল সিটের মিগ-২৫আর এবং ২টি ডাবল সিটের ট্রেনার। এই বিশেষ যুদ্ধবিমানের কাজ ছিল একটাই — গুপ্তচরবৃত্তি। শত্রু দেশের ছবি তুলে আনা।
সেদিন ইসলামাবাদের মানুষ যে শব্দ শুনেছিলেন, সেটা ছিল সোনিক বুম। যখন কোনও বিমান শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে যায়, তখন তার পিছনে যে শকওয়েভ তৈরি হয়, মাটি থেকে সেটাই বিস্ফোরণের মতো শোনায়। ওই স্কোয়াড্রনের প্রাক্তন পাইলট উইং কমান্ডার পি জে ঠাকুর পরে এক সর্বভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, ” সেদিন বিমানটি সীমান্ত পেরিয়েছিল। ২০ কিলোমিটার উচ্চতায়, ২.৪ ম্যাক গতিতে, এগিয়েছিল বিমানটি।”
সেই সঙ্গে তিনি একটি ভুল ধারণাও ভেঙে দেন। অনেকে বলেছিলেন, ভারত ইচ্ছে করে পাকিস্তানকে ভয় দেখাতে সুপারসনিক গিয়েছিল। ঠাকুরের জবাব, “২০ কিলোমিটার উচ্চতায় মিগ-২৫ কখনও সাবসনিক হতে পারে না। হলে আকাশ থেকেই পড়ে যাবে। ওই উচ্চতায় উড়তে গেলে তাকে সুপারসনিক হতেই হবে। জানালা ভাঙার গল্পগুলো কল্পনা।”
এখন প্রশ্ন উঠছে তাহলে মিশনটা কী ছিল? গোপন ফটোগ্রাফি! পাকিস্তানের কোনও সংবেদনশীল সামরিক বা কৌশলগত স্থাপনার ছবি তোলা?
জানা যায়, পাকিস্তান বিমান বাহিনী সেদিন মিগ-২৫ এর গতিবিধি কিছুটা রাডারে ধরতে পেরেছিল। কিন্তু ততক্ষণে ফক্সব্যাট অনেক দূরে। এটাই ছিল মিগ-২৫-এর নিয়ম। ২০ কিলোমিটার উচ্চতায় মিনিটে ৪০ কিলোমিটার পাড়ি দিত সে। তাকে ধরার একমাত্র উপায় ছিল সামনে থেকে হেড-অন অ্যাটাক। ঠাকুরের কথায়, “সেই সমীকরণ ভেস্তে দিতে মাত্র ৫ ডিগ্রি কোর্স বদলই যথেষ্ট ছিল।”
ঠাকুরের কথায়, এই বিমানের কাজ করার পদ্ধতিটাই ছিল সিনেমার মতো। এর নাকে থাকত পাঁচটি বিশাল ক্যামেরা। চারটি পাশে তাক করা, যারা ১০০ কিলোমিটার চওড়া এলাকার ছবি তুলতে পারত। পঞ্চমটি নিচের দিকে, যা প্রতিটি ছবির নিখুঁত ল্যাটিটিউড-লঙ্গিটিউড রেকর্ড করত, যাতে বোমারু বিমানকে সঠিক টার্গেট দেওয়া যায়। ক্যামেরার ফিল্মের রোল ছিল ৩০-৩২ ইঞ্চি চওড়া, প্রায় একটা সোফার সমান বড়। মিগ-২৫ যখন উড়ত, অন্য এয়ারবেসগুলোকে শুধু বলা হত, “একটা কিছু আসতে পারে, তৈরি থেকো।” কখন উড়বে, কোথা দিয়ে ঢুকবে, কেউ জানত না।
এই বিমানই কার্গিল যুদ্ধে অন্য রূপে কাজে লেগেছিল। ১৯৯৯ সালে মিরাজ ২০০০ পাইলটরা টার্গেট খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন ঠাকুর তাঁর ফক্সব্যাটকে তার সুরক্ষিত ২০ কিলোমিটার থেকে নামিয়ে আনেন ১০ কিলোমিটারে, পাহাড়ের চূড়া থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার উপরে। গতি কমিয়ে আনেন ম্যাক ০.৯৫-এ। এতে জ্বালানি বেশি পুড়ছিল, ঝুঁকিও ছিল অনেক বেশি। তাই প্রথমবারের মতো ফক্সব্যাটকে পাহারা দিতে ওড়ে মিরাজ ২০০০ এবং মিগ-২৯। সেই ছবি থেকেই ভারতীয় বায়ুসেনা পাকিস্তানি বাংকারগুলোর নিখুঁত কো-অর্ডিনেট পায়।
কিন্তু সব গল্পেরই শেষ আছে। ২০০০ সালের পর স্যাটেলাইট চলে এল। মহাকাশ থেকেই সাব-মিটার রেজোলিউশনের ছবি পাওয়া যেতে লাগল। যে কাজের জন্য পাইলটের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে হত, তা এখন ঘরে বসেই হচ্ছে। ২০০৬ সালের ১লা মে, ২৫ বছরের গোপন ইতিহাস নিয়ে অবসর নেয় ভারতের মিগ-২৫।