দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বা ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD) হলো এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যেখানে কিডনি দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারাতে থাকে। আমাদের কিডনি রক্ত থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত জল বের করে দেয় এবং শরীরের জল, লবণ ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখে। কিডনি ঠিকমতো কাজ না করলে শরীরে ক্ষতিকর পদার্থ জমতে শুরু করে। সাধারণত তিন মাস বা তার বেশি সময় ধরে কিডনির গঠন বা কার্যক্ষমতার সমস্যা থাকলে তাকে দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বলা হয়।
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের লক্ষণ কী কী?
রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। রোগ বাড়তে থাকলে কয়েকটি উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে, যেমন—
পা, গোড়ালি, মুখ বা চোখের চারপাশ ফুলে যাওয়া।
প্রস্রাবের পরিমাণ বা প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তন।
প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা দেখা যাওয়া।অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্তি, দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট।
বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা ও ঘুমের সমস্যা।ত্বকে চুলকানি এবং পেশিতে টান ধরা।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকা।
কী কারণে এই রোগ হয়?
দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের অন্যতম কারণ হলো ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ। এ ছাড়া কিডনির প্রদাহ, বংশগত কিডনি রোগ, বারবার কিডনিতে সংক্রমণ, প্রস্রাবের পথে বাধা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন কিছু ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার কারণেও কিডনির ক্ষতি হতে পারে।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা:
কিডনি রোগ সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্তের ক্রিয়েটিনিন ও ইজিএফআর (eGFR), প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিন পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে হয়। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করা বিশেষভাবে জরুরি।
করণীয় ও উপশমের উপায়:
১. রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন করুন এবং নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন।
২. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: খাবারে অতিরিক্ত নুন কমান। প্রোটিন, পটাশিয়াম ও ফসফরাসের পরিমাণ কিডনির অবস্থার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। তাই চিকিৎসক বা কিডনি-বিষয়ক পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
৩. পর্যাপ্ত জল পান: সবার জন্য একই পরিমাণ জল উপযুক্ত নয়। কিডনির কার্যক্ষমতা, শরীরে ফোলা ও প্রস্রাবের পরিমাণ অনুযায়ী চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে জল পান করুন।
৪. ওষুধে সতর্কতা: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ, ভেষজ ওষুধ বা কিডনি ভালো করার নামে কোনো অপ্রমাণিত পণ্য ব্যবহার করবেন না।
৫. সুস্থ জীবনযাপন: ধূমপান বর্জন করুন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন এবং পর্যাপ্ত ঘুমান।
৬. নিয়মিত ফলোআপ: কিডনির অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করান। রোগের শেষ পর্যায়ে প্রয়োজন হলে ডায়ালিসিস বা কিডনি প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা করতে হতে পারে।
কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?
প্রস্রাব হঠাৎ খুব কমে গেলে, তীব্র শ্বাসকষ্ট হলে, বুকে ব্যথা হলে বা অস্বাভাবিক তন্দ্রা ও বিভ্রান্তি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যান।
মনে রাখবেন, দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ সব সময় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও সঠিক চিকিৎসা ও জীবনযাপনের মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি ধীর করা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা সম্ভব।