কোয়েল বণিক, কলকাতা : উৎসবের মরসুম মানেই বাঙালির কেনাকাটার উন্মাদনা। নতুন পোশাক, উপহার আর গয়নার ঝলকানিতে ভরে ওঠে বাজার। আর সেই তালিকায় সোনা কেনা যেন এক অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য। কারণ, বাঙালির কাছে সোনা শুধুমাত্র একটি ধাতু নয়, বরং সম্পদ, ঐশ্বর্য ও শুভলগ্নের প্রতীক। কিন্তু এই বছর উৎসবের মাঝেই দেশের বাজারে সোনার দাম তুঙ্গে, যা চিন্তায় ফেলেছে সাধারণ ক্রেতাদের।
কলকাতা সহ দেশের বিভিন্ন শহরে প্রতিদিনই সোনার দর নতুন করে নির্ধারণ হচ্ছে। শনিবার প্রকাশিত সর্বশেষ দরে দেখা যাচ্ছে, ২২ ক্যারেট ও ২৪ ক্যারেট সোনার দাম আগের দিনের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের টানাপোড়েন, ডলারের বিনিময়মূল্য এবং দেশীয় চাহিদা-যোগানের ভারসাম্যহীনতা।
ভারতের সংস্কৃতিতে নবরাত্রি, দুর্গাপূজা, ধনতেরাস ও দীপাবলির সময় সোনা কেনা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে ধনতেরাসের দিন এক টুকরো সোনা কেনা ‘লক্ষ্মীলাভের প্রতীক’ হিসেবে ধরা হয়। তাই এই সময়টাতে সোনার দোকানে ভিড় থাকে তুঙ্গে। গয়নার পাশাপাশি অনেকেই এই সময় সোনায় বিনিয়োগ করাকে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখেন।
তবে সোনার দামের উত্থান-পতনের পেছনে শুধুমাত্র উৎসবকালীন চাহিদাই নয়, বিশ্ব অর্থনীতির বড় ভূমিকা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম নির্ভর করে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, তেলের দামের ওঠানামা, মার্কিন ডলারের শক্তি, এবং বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কার উপর। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য ‘শাটডাউন’, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতির অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে সোনা আবারও এক ‘Safe Haven’ বা নিরাপদ বিনিয়োগে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে যখন ইক্যুইটি বা শেয়ার বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়, তখন বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে সোনা বা অন্যান্য মূল্যবান ধাতুতে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়ে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলে ভারতের খুচরো বাজারেও।
অন্যদিকে, দেশীয় বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যও বড় ভূমিকা রাখে। উৎসবের সময় সোনার দোকানগুলিতে বাড়তি চাহিদা দেখা যায়, ফলে দামও কিছুটা বৃদ্ধি পায়। কলকাতা, মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাই—সব শহরেই এই সময়ে বিক্রি থাকে চাঙা। অনেক স্বর্ণকারই বলছেন, “দাম বাড়লেও বাঙালি সোনা কেনা বন্ধ করবে না, কারণ এটা শুধুমাত্র আর্থিক নয়, আবেগের বিষয়।
তবে সাধারণ ক্রেতাদের চিন্তা অন্য জায়গায়। দৈনন্দিন খরচের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সোনার বাড়তি দাম অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেকেই এখন ছোট আকারের গয়না বা হালকা ওজনের অলঙ্কারের দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ আবার বিকল্প হিসেবে ‘গোল্ড কয়েন’ বা ‘সোনা সেভিং স্কিম’-এর দিকে আগ্রহী হচ্ছেন।
বাজার বিশ্লেষকদের পরামর্শ, উৎসবের উচ্ছ্বাসে ভেসে না গিয়ে, দামের ওঠানামা বুঝে, প্রয়োজনে কিস্তিতে সোনা কেনা বা আগে থেকে বুকিং করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতাই দেশের বাজারে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সব মিলিয়ে, উৎসবের আলোয় ঝলমল করছে বাজার, তবুও সোনার দামের এই অনিশ্চয়তা সাধারণ ক্রেতাদের মনেও কিছুটা ছায়া ফেলেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের কাছে এই সময়টাই বরং সুযোগ—কারণ সোনা আবারও প্রমাণ করছে, সময় যতই বদলাক, সে এখনো ‘নিরাপদ আশ্রয়’-এর প্রতীক।
