মৌসুমী পাল, কলকাতা : একসময় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে রাজপথে নেমেছিল রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস। দাবি ছিল, ভারত বৈচিত্র্যের দেশ এখানে একটিমাত্র ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত। প্রতিবাদের ভাষা ছিল স্পষ্ট “বাংলা আমাদের মাতৃভাষা, সেটিকে অবহেলা করা চলবে না।” সেই সময় শাসক দলের নেতৃত্বে কলকাতার বুকে হয়েছিল বিশাল প্রতিবাদ মিছিল, কেন্দ্রের বিরুদ্ধে উঠেছিল একাধিক স্লোগান।
তবে সময় ঘুরতেই যেন পাল্টে গেছে সেই অবস্থান। এবার নিজেরাই একপ্রকার ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার পথে হাঁটল রাজ্যের শাসক দল পরিচালিত কলকাতা পুরসভা (Kolkata Municipal Corporation)। পুরসভার চেয়ারপার্সন মালা রায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পুরসভার অধিবেশন বা কার্যবিবরণী সভায় কাউন্সিলরদের হিন্দি বা ইংরেজিতে নয়, শুধুমাত্র বাংলায় প্রশ্ন করতে হবে। মেয়র পারিষদরাও বাংলাতেই উত্তর দেবেন।
মালা রায়ের বক্তব্য, “এটা বাংলা ভাষার প্রাধান্য রক্ষার জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত। অধিবেশনে বেশিরভাগ প্রশ্ন বাংলায় হয়, কিন্তু কিছু কাউন্সিলর এখনও ইংরেজি বা হিন্দিতে প্রশ্ন করেন। এটা আর চলবে না।” সেই নির্দেশ ইতিমধ্যেই বাস্তবে প্রয়োগ হয়েছে। পুরসভার ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোনালিসা বন্দ্যোপাধ্যায় ইংরেজিতে প্রশ্ন জমা দিলে, চেয়ারম্যান সঙ্গে সঙ্গে মেয়রকে অনুরোধ করেন বাংলায় উত্তর দিতে এবং জানিয়ে দেন, এখন থেকে সবকিছু বাংলাতেই চলবে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন করে ঘোষিত ‘ভাষা আন্দোলন’-এর আবহ স্পষ্ট। ভিনরাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলার ‘অপরাধে’ বাঙালিদের হেনস্থা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে ২৭ জুলাই থেকে রাজ্যজুড়ে ভাষা আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর মতে, বাংলা ভাষার ওপর আঘাত হচ্ছে এই অবস্থায় মুখ বুজে থাকা চলবে না। তবে এখানেই উঠছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে দল একদিন ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছিল, তারা কি আজ একই কাজ করছে অন্য ভাষাভাষীদের সঙ্গে?
এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে বিজেপি। কলকাতা পুরনিগমের বিজেপি কাউন্সিলর সজল ঘোষ বলেন, “যাঁরা একদিন হিন্দি চাপানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন, আজ তাঁরাই বাংলাকে বাধ্যতামূলক করছেন। এটা দ্বিচারিতা ছাড়া কিছুই নয়।” তিনি কটাক্ষ করে আরও বলেন, “৮ হাজার বাংলা মাধ্যম স্কুল বন্ধ করে এখন আবার ভাষা নিয়ে আবেগ দেখাচ্ছেন! এটা ভাষার নামে বিভাজনের রাজনীতি।” তাঁর আরও প্রশ্ন যাঁরা বাঙালি নন, তাঁদের কী হবে? কিন্তু পুরসভার চেয়ারপার্সনের যুক্তি, “যাঁরা বাংলায় থাকছেন, তাঁদের বাংলা জানা উচিত। ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বাংলা অপরিহার্য। শুধু ইংরেজি বলে স্টাইল দেখানোর দিন শেষ।”
ভাষার মর্যাদা রক্ষার অজুহাতে এই নির্দেশ কার্যত একপাক্ষিক ভাষানীতি হয়ে উঠছে। এভাবে বাধ্যতামূলক করে নয়, বরং বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে ব্যবহার করার পরিবেশ তৈরি করা দরকার। সার্বিকভাবে বলতে গেলে, যে নীতির একদিন তীব্র নিন্দা করেছিল, আজ সেই পথেই হাঁটছে সরকার’। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আড়ালে নতুন এক রাজনৈতিক ভাষা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল কিনা, তা নিয়ে চলছে তীব্র আলোচনা। ভাষা আবেগের, কিন্তু সেটা যদি ক্ষমতার চাপে এসে দাঁড়ায়, তখনই সেটা ভাষার প্রতি ভালবাসা পাল্টে হয়ে যায় রাজনীতির নতুন হাতিয়ার।
