নিজস্ব সংবাদদাতা : প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে ভারতীয় জনতা পার্টির উদ্যোগে পালিত হবে মাসব্যাপী ‘সেবা সংকল্প অভিযান’। পশ্চিমবঙ্গেও বুথ থেকে জেলা স্তর পর্যন্ত এই কর্মসূচি ব্যাপকভাবে পালন করা হবে। সোমবার বিজেপির সল্টলেক কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে এই কর্মসূচির কথা জানালেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আগামী ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে থাকার ২৫ বছর পূর্ণ হবে। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এত দীর্ঘ সময় প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে থাকা ভারতীয় রাজনীতিতে নজিরবিহীন। এই ২৫ বছরের প্রশাসনিক যাত্রা এবং এই সময়ে দেশের মানুষের জন্য নেওয়া বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতেই এই ‘সেবা সংকল্প অভিযান’।
শমীক বলেন, ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি বুথ, মণ্ডল, ব্লক, মহকুমা এবং জেলা স্তরে এই কর্মসূচি পালন করা হবে। আগামী ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর প্রতিটি জেলা সংগঠনের পক্ষ থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে নিজ নিজ জেলার কর্মসূচির বিস্তারিত রূপরেখা ঘোষণা করা হবে।
১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে তাঁর সুস্থ শরীর, দীর্ঘায়ু ও সাফল্য কামনা করে রাজ্যের প্রতিটি বুথে অন্তত ২৫টি প্রদীপ প্রজ্বলনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ইতিমধ্যেই দলীয় কর্মীরা এই কর্মসূচির প্রস্তুতি শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন শমীক ভট্টাচার্য।
প্রধানমন্ত্রীর ২৫ বছরের প্রশাসনিক যাত্রা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রকাশ করা হবে একটি তথ্যচিত্র ও থিম সং। ‘নমো সেবা গাথা’-র মাধ্যমে বিভিন্ন স্তরে প্রধানমন্ত্রীর প্রশাসনিক কর্মযজ্ঞ এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি ‘সেবা জ্যোতি যাত্রা’-র মাধ্যমে জেলা ও মণ্ডল স্তর থেকে এই কর্মসূচিকে বিকেন্দ্রীকৃতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। শমীক বলেন, শুধু রাজনৈতিক প্রচার নয়, এই এক মাসকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি সেবামূলক অভিযান হিসেবেও গড়ে তোলা হবে।
১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ‘সেবায় আমার অবদান’ কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন সামাজিক ও সেবামূলক কাজে যুক্ত করা হবে। নিজের এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখা, প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো, নদী ও জলাধার সংস্কার, জল সংরক্ষণ, বর্জ্য পৃথকীকরণসহ বিভিন্ন কাজে মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। দলের রাজ্য সভাপতি বলেন, ১৪০ কোটি মানুষের দেশে সরকারের পক্ষে প্রতিটি সমস্যার সমাধান একা করা সম্ভব নয়। সমাজের মানুষকে সরকারি উদ্যোগের অংশীদার করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। সেই ভাবনা থেকেই এই কর্মসূচি।
এই কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে ‘সেবা সেতু অভিযান’। তিন দিনের বিশেষ শিবিরের মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত যোগ্য মানুষদের সহায়তা করা হবে। প্রত্যেক ব্লকে এই শিবির হবে এবং পরবর্তীতে তা বুথ স্তর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। আবেদনপত্র পূরণ, ডিজিটাল প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সহযোগিতা করা হবে। আয়ুষ্মান ভারত, অন্নপূর্ণা যোজনা, বার্ধক্যভাতা সহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের যোগ্য উপভোক্তারা যাতে কোনও কারণে সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করার জন্য দলীয় কর্মীরা কাজ করবেন।
পাশাপাশি এদিন রাজ্য সভাপতি অভিযোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় জনকল্যাণমূলক প্রকল্প রাজনৈতিক কারণে বা রাজ্য সরকারের অসহযোগিতার ফলে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি বিশেষ ভাবে পিএম সূর্য ঘর মুফত বিজলি যোজনা, আয়ুষ্মান ভারত, পিএম বিশ্বকর্মা যোজনা এবং কিষাণ সম্মান নিধি-র প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গে যোগ্য মানুষ যাতে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হন, ‘সেবা সংকল্প অভিযান’-এর মাধ্যমে সেই বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
শিশুদের জন্য বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি এবং বিভিন্ন সৃজনশীল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে। দেশের বিপুল সংখ্যক শিশুকে এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাজ্য সভাপতি। তিনি এও জানান, তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী প্রতিভাকে উৎসাহিত করতে কলকাতা সহ পাঁচটি শহরে সায়েন্স কংগ্রেস আয়োজন করা হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণ বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবকদের এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের চারুকলা কলেজগুলিকেও এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা হবে। তাঁদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ২৫ বছরের প্রশাসনিক যাত্রা এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় উদ্যোগকে মানুষের সামনে তুলে ধরা হবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পে উপকৃত পরিবারগুলির জীবনযাত্রায় যে পরিবর্তন এসেছে, তা তুলে ধরতে ২৫ লক্ষ উপভোক্তা পরিবারের সাফল্যের কাহিনি সংগ্রহ ও প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের কাহিনি তুলে ধরা হবে সামাজিক মাধ্যম, ইনস্টাগ্রাম এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ‘গেরুয়া বঙ্গ’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিজেপি ‘গেরুয়া বঙ্গ’ শব্দবন্ধে বিশ্বাস করে না। তাঁর কথায়, গেরুয়া ত্যাগের প্রতীক এবং ভারতীয় সংস্কৃতির বহমানতার প্রতীক। তাই ‘গেরুয়া ঝড়’, ‘গেরুয়া প্রতীক’ বা ‘শিক্ষার গৈরিকীকরণ’-এর মতো শব্দবন্ধ বিজেপি গ্রহণ করে না।
প্রধানমন্ত্রীকে এই এক মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে আনার কোনও পরিকল্পনা রয়েছে কি না, জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে আনার চেষ্টা করা হয় না, তিনি নিজেই বিভিন্ন রাজ্যে যান। এই মুহূর্তে তাঁর সফর সম্পর্কে দলের কাছে কোনও নির্দিষ্ট তথ্য নেই। জেন-জি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে সমাজের অন্য অংশ থেকে আলাদা করে দেখার মানসিকতা ঠিক নয়। তাঁদের প্রশ্ন করার অধিকার এবং নিজেদের ভাষায় নিজেদের বক্তব্য প্রকাশ করার অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশে তরুণরা সামাজিক সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করছেন, আলোচনা করছেন এবং প্রতিবাদ করছেন—এটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বিষয়। বিজেপি তরুণদের এই প্রশ্ন করার অধিকারকে খর্ব করবে না।
বাঙালির খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক প্রসঙ্গে শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট করে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে কে কী খাবেন বা কী পরবেন, তা নিয়ে বিজেপির কোনও বক্তব্য নেই। বাঘেশ্বর বাবার নিরামিষ খাওয়ার আবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন সাধক হিসেবে তিনি তাঁর মতামত বা পরামর্শ দিতে পারেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কী খাবেন, সেই সিদ্ধান্ত বাঙালির নিজস্ব বিষয়। তিনি বলেন, বাঙালি যে সংস্কৃতি ও অভ্যাসে অভ্যস্ত, সেই অনুযায়ী চলবে। কেউ মাছ-মাংস খাবেন, কেউ নিরামিষ খাবেন—এটি ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। কাউকে কী খেতে হবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া বিজেপির অবস্থান নয়।