ওঙ্কার ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের অস্থিরতার জেরে ভারতে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রা সতর্ক করে জানিয়েছেন, “পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত যদি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেয়, তাহলে দেশের অর্থনীতিতে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে এবং পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না”।
গত সোমবার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশবাসীকে গণপরিবহন ব্যাবহার বাড়াতে আর্জি জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি ব্যায়বহুল পন্য যেমন সোনা, রত্ন কেনা থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন। পাশাপাশই প্রয়োজন ছাড়া বিদেশভ্রমন না করার কথাও বলেছিলেন তিনি। অফিস, বিদ্যালয় গুলিকেও বাড়ি থেকে পরিচালনার অনুরোধ করেছিলেন মোদী। প্রধানমন্ত্রীর এই মন্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি ছিল যে, ভারত এক আমদানি নির্ভর দেশ। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সময়ব্যাপী অশান্তির জেরে ব্যপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। এই সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণে দেশের সার্বিক অর্থনীততে ইতিবাচক প্রভাব পরবে বলেই আশ্বাস রেখে দেশের মানুষের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেছিল, কেন্দ্রের কোনো উচ্চ পদস্থ ব্যাক্তি দেশে সম্ভাব্য মুল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রকাশ্যে সরব না হলেও প্রধানপমন্ত্রীর মন্তব্য তারই ইঙ্গিত। এবার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর সেই আশঙ্কাতেই কার্যত শীল্মোহর দিল।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। দেশের মোট অপরিশোধিত তেলের একটি বড় অংশ আমদানি করা হয় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ, সামরিক উত্তেজনা বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে সেই আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি ভারতের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের উপর। কিন্তু সেই মূল্যবৃদ্ধির আঁচ দেশের মানুষের উপর পরতে দেয়নি সরকার। পাশাপাশি অপরিশোধিত তেলের উপর কোম্পানিগুলিকে ছাড়ও দিয়েছিল পেট্রলিয়াম মন্ত্রক।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তরফে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে তা শুধু পরিবহণ খরচই বাড়াবে না, বরং খাদ্যপণ্য, শিল্পপণ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিরও অন্যতম কারণ হয়ে উঠবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার আপাতত খুচরো বাজারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি এড়িয়ে চললেও, দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ক্ষেত্রে সেই নীতি বজায় রাখা কঠিন হবে বলেই মনে করছে অর্থনৈতিক মহল।
সরকারি তেল বিপণন সংস্থাগুলির উপর ইতিমধ্যেই বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও দেশে দাম স্থিতিশীল রাখার ফলে সংস্থাগুলিকে লোকসান বহন করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে কেন্দ্রকে হয় কর কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে, নয়তো সরাসরি জ্বালানির খুচরো মূল্য বাড়ানোর পথে হাঁটতে হতে পারে। বিশেষ করে পরিবহণ, কৃষি, শিল্প এবং দৈনন্দিন বাজার ব্যবস্থার উপর জ্বালানির দামের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পেট্রল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি হলে তার প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে পড়বে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের উপর আর্থিক চাপ বাড়বে, পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতিও শ্লথ হবে। সংঘাত যদি দ্রুত না মেটে, তাহলে আগামী দিনে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা হয়ে দেখা দিতে পারে।