তাপস মহাপাত্র
জোহরান মামদানির এই ঐতিহাসিক বিজয়ের যাত্রা এক কথায় স্বপ্নময়। গত গ্রীষ্মে রাজ্য আইন প্রণেতা হিসেবে তার পরিচিতি তিন বছরের। অথচ তাঁর বুকে সংকোচ চিল না তিলমাত্র। মাথায় ভর করে নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র হওয়ার সাধ। এমন এক কার্যত অলৌকিক বাসনা নিয়ে তিনি যান তাঁর রাজনৈতিক বন্ধুদের কাছে। কথায় কথায় মেয়র পদে ভোটে লড়াইয়ের কথা তোলেন।
তারপর কী ভাবে যে এগুলো ঘটনাপ্রবাহ, ফ্রিরে তাকাননি তিনি। বুকে অদম্য জেদ, যা তাঁর আশার মতো কোমলতাকে ছাপিয়ে যায়। বেরিয়ে আসে এক দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব। জন আকর্ষণী ক্ষমতা। শেষমেষ সবক্লাসিক ডেভিড বনাম গোলিয়াথ যুদ্ধে, ব্যাকবেঞ্চ অ্যাসেম্বলিম্যান জোহরান মামদানি প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে পরাজিত করে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে নিউ ইয়র্কের সর্বকনিষ্ঠ মেয়র হন। বয়স মাত্র ৩৪ বছর। আমেরিকার বৃহত্তম শহরের ১১১তম মেয়র হিসেবে তার নির্বাচন এক নয়া ইতিহাস তৈরি করল।
এই ঐতিহাসিক জয়ের পথে মামদানির যাত্রা সত্যিই অসাধারণ ছিল। বছরের শুরুতে তাঁর বন্ধুরা এই জয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। আশঙ্কা ছিল। কারণ, তাঁর ঝুলিতে ভোট ছিল মাত্র ১ শতাংশ। সেই সময় নিউ ইয়র্কের কেউই তাঁকে চিনতে পারেননি। শুধু বাইরের নয়, তাঁর দলই ধরে নিয়েছিল জয়ের সম্ভাবনা মাত্র ৩ শতাংশ।
অন্যদিকে প্রাক্তন গভর্নর কুওমোর ছিল দোর্দণ্ড্য প্রতাপ। নিউ ইয়র্কের ৫৬তম গভর্নর হিসেবে, তিনি একজন পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। যাঁকে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিনটনের মতো ডেমোক্র্যাটিক নেতারা সমর্থন করেছিলেন। তাঁর কোটিপতি সমর্থকদের আনুকূল্যে প্রচারের উজ্জ্বল আলো ছিল। লক্ষ লক্ষ ডলার অনুদান দিয়েছিলেন তাঁরা।
কিন্তু একটি জাঁকজমকপূর্ণ এবং নিয়ম-ভঙ্গকারী প্রচারসভাই বদলে দিল ছবি। যা কুইন্স ক্যাবি এবং ব্রুকলিনের মানুষদের একত্রিত করেছিল শহরের অত্যধিক বেড়ে ওঠা মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে। মামদানিকে বিশ্বজুড়ে বেশিরভাগ মানুষের সোশ্যাল মিডিয়া ফিডে স্থান করে দেয়, এমনকি মার্কিন রাষ্ট্রপতিকেও তার উপস্থিতি স্বীকার করতে বাধ্য করে।
গত বছর অক্টোবরে শুরু করা “ডিজিটাল-ফার্স্ট” প্রচারে মামদানি প্রথম আসেন ভিডিওতে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, “এই শহরের জীবন এত কঠিন হওয়ার দরকার নেই।” তিনি প্রতিদিনের নিউ ইয়র্কবাসীদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর নীতিমালার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল বিনামূল্যে শিশু যত্ন, বিনামূল্যে বাস এবং সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন। এবং তা সামাল দিতে ধনীদের উপর কর বৃদ্ধির কথা বলেছিলেন।
স্প্যানিশ, বাংলা, হিন্দি এবং উর্দুতে ভিডিওগুলি রেকর্ড করে অচিরেই তিনি হয়ে ওঠেন তৃণমূল স্তরের এক ব্যক্তি। খাদ্য-ট্রলার শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় তিনি ‘Halal-Flation এর মতো শব্দ তৈরি করেছিলেন এবং “Freezing Rents” বক্তব্যকে জোরদার করার জন্য পূর্ণ পোশাক পরে কোনি দ্বীপের ঠান্ডা জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
বিশ্লেষকরা অবশ্য তাঁকে একজন প্রান্তিক প্রার্থী হিসেবে ধর্তব্যের মধ্যে রাখেনি। কিন্তু প্রজন্মগত এবং আদর্শের দিক থেকে তরুণ ভোটারদের কাছে তিনি অনুরণিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালের পর তিনিই প্রথম প্রার্থী যিনি পাঁচটি বরোতে মেয়র নির্বাচনে দশ লক্ষেরও বেশি ভোট জিতেছিলেন এবং ২০ লক্ষেরও বেশি নিউ ইয়র্কবাসী তাঁদের ভোট দিয়েছিলেন। বিজয় ভাষণে মামদানি নিউ ইয়র্কবাসীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, “আমি প্রতিদিন সকালে একটি একক উদ্দেশ্য নিয়ে ঘুম থেকে উঠব যাতে এই শহর আগের দিনের চেয়ে তোমাদের জন্য আরও ভালো করে তোলা যায়”।
