কলকাতা: বাংলায় বাণিজ্য়তরী ছুটছে গতিতে। এবার বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে নবান্নে আসছেন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শীর্ষ কর্তারা। আজ, বুধবার দুপুর আড়াইটেয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং মুখ্যসচিবের সঙ্গে বৈঠক করবেন সংস্থার বিভিন্ন শাখার সিইও-সহ শীর্ষ আধিকারিকদের একটি দল। নবান্ন সূত্রে খবর, এই প্রথমবার রিলায়েন্সের টপ ম্যানেজমেন্ট সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যসচিবের সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনায় বসছে।
অন্য়দিকে, এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল। কারণ, সম্প্রতি নিউ টাউনে ২০০০ শয্যার হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে আদানি গোষ্ঠী। এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলায় ১ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাঁরা। এই অবস্থায় রিলায়েন্সের শীর্ষ কর্তাদের এই বৈঠক নিসন্দেহে আশার আলো দেখাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ সরকারি আধিকারিক জানিয়েছেন, “রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিভিন্ন শাখার সিইও-সহ শীর্ষ আধিকারিকদের একটি দল বুধবারের বৈঠকে যোগ দেবে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও মুখ্যসচিবের সঙ্গে বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনার জন্য এই প্রথমবার গোষ্ঠীর শীর্ষ আধিকারিকরা বৈঠকে আসছেন।” প্রশাসনের একাংশের মতে, এর আগে রিলায়েন্স চেয়ারম্যান তৃণমূল সরকারের আমলে কয়েকটি বিজনেস সামিটে যোগ দিলেও, বড় কোনও বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়নি।
রিলায়েন্স সূত্রে জানা গিয়েছে, তারা মূলত ছয়টি ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবে — ডেটা সেন্টার, আন্তর্জাতিক কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন, কোল গ্যাসিফিকেশন, ফুড পার্ক, সড়ক পরিকাঠামো এবং হাসপাতাল।
ইতিমধ্যেই রাজারহাটের সিলিকন ভ্যালি হাবে ৪০ একর জমি নিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করেছে রিলায়েন্স। দিঘায় একটি কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন তৈরির প্রস্তাবও দিয়েছে তারা, যা সমুদ্রের নিচ দিয়ে যাওয়া ডেটা কেবলের মাধ্যমে বাংলাকে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করবে।
সংস্থার এফএমসিজি ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য উত্তরবঙ্গে একটি ফুড পার্ক গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাজার ধরা হবে। কোল গ্যাসিফিকেশন রিলায়েন্সের জন্য একটি নতুন ক্ষেত্র, যেখানে মাটির গভীরে থাকা কয়লাকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পুড়িয়ে মিথেন গ্যাস তৈরি করা হয়। এই প্রযুক্তি পূর্ব ভারতের জন্য উপযুক্ত। এছাড়াও, মুম্বইয়ের মতো একটি মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল বাংলায় তৈরির ভাবনা রয়েছে, যদিও তা সিএসআর প্রকল্প হিসেবে হবে এবং স্থান এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
সূত্রের খবর, নতুন সরকার ডেটা সেন্টার এবং এআই-ভিত্তিক ক্লাউড পরিকাঠামোর মতো উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি প্রকল্প আনতে আগ্রহী, যাতে শিক্ষিত যুবকদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবাকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। এক আধিকারিকের মতে, ৩৪ বছরের বাম শাসন এবং ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের আমলে স্বাস্থ্য ক্ষেত্র অবহেলিত হয়েছে, ফলে ভাল চিকিৎসার জন্য মানুষকে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে যেতে হয়। আদানিদের হাসপাতাল ছিল নতুন সরকারের প্রথম সাফল্য, এবার রিলায়েন্সকেও এই ক্ষেত্রে আনতে চাইছে সরকার।
পরিকাঠামো ক্ষেত্রেও বড় বিনিয়োগ চাইছে সরকার। তার মধ্যে অন্যতম হল বন্দর এলাকা থেকে হাওড়ার আন্দুল পর্যন্ত নদীর নিচ দিয়ে সড়ক সুড়ঙ্গ তৈরির পরিকল্পনা, যা শহরের যানজট কমাবে। কোল গ্যাসিফিকেশন নিয়েও সরকারের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। বীরভূমের দেউচা-পাঁচামি কয়লা ব্লকের ৩০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ গ্যাসিফিকেশন, ৩০ শতাংশ ওপেন-কাস্ট এবং ৪০ শতাংশ ভূগর্ভস্থ খননের মাধ্যমে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এক আধিকারিকের কথায়, “রিলায়েন্স এগিয়ে এলে দেউচা-পাঁচামি প্রকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন গতি পাবে।”
প্রশাসন সূত্রে খবর, গত ২১ সেপ্টেম্বর মুম্বইতে রিলায়েন্স চেয়ারম্যানের বাসভবনে গিয়ে বৈঠক করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২২ সেপ্টেম্বর এক্স হ্যান্ডেলে মুখ্যমন্ত্রী লেখেন, পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থান তৈরির বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে দুজনের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে। তিনি লেখেন, “আমাদের রাজ্য দূরদর্শী বিনিয়োগকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত, যা আমাদের যুব সমাজকে শক্তিশালী করবে এবং টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুত্থান ঘটাবে।”