মৌসুমী পাল: শান্তি শব্দটা শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে আসে যুদ্ধহীন বিশ্ব, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ, মানবতার জয়গান। আর নোবেল শান্তি পুরস্কার সেটাই তো এই স্বপ্নের স্বীকৃতি। কিন্তু এই ২০২৫-এ এসে শান্তির সংজ্ঞা একটু যেন পাল্টে যাচ্ছে। অন্তত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নোবেল মনোনয়ন ঘিরে যা সব ঘটছে, তাতেই মনে হচ্ছে। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের এক নৈশভোজে গিয়ে ট্রাম্পের হাতে তুলে দিলেন নোবেল কমিটিকে পাঠানো মনোনয়নের নথি। নেতানিয়াহুর যুক্তি সরল “ট্রাম্প গোটা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করছেন।” সমসাময়িক ঘটনার প্রেক্ষিতে নেতানিয়াহুর মুখে এমন কথা শুনে অবাক হওয়াটা স্বাভাবিক। প্যালেস্টাইনে গোলা বর্ষন, গাজা ভষ্মীভূত রুপ ইরানের উপর নিষেধাজ্ঞার পাহাড় , সবই কি তাহলে শান্তিরই অংশ?
শান্তির এই বিশ্বদূতের আরেক বড় গুণমুগ্ধ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরও। তিনিও সম্প্রতি ট্রাম্পকে শান্তির দূত হিসাবে তুলে ধরেছেন। পাকিস্তান সরকারও নোবেল কমিটিকে চিঠি পাঠিয়ে বলেছে, ট্রাম্প নাকি ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে সংঘর্ষ বিরতিতে বড় ভূমিকা নিয়েছেন। ভারত অবশ্য বলে, এই দাবি গুজব ছাড়া কিছু নয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও স্পষ্টই বলেছেন, “মধ্যস্থতার কিছুই নেই, পাকিস্তান যা বলছে তা ভিত্তিহীন।” যদিও এই মনোনয়ন খেলা শুনে নোবেল কমিটির মাথায় হাত পড়তে পারে। কার হাতে শান্তি পুরস্কার যাবে, যিনি ইরানের উপর মিসাইল হামলা করান, যিনি ব্রিকসকে শুল্কের অযুহাতে বড় বড় হুমকি দেন, যিনি মাঝেমধ্যেই অর্ধেক দুনিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাবুক ফেলেন তিনি হবেন শান্তির দূত। হয়তো এটাই আধুনিক ‘শান্তি’ সংজ্ঞা আসিম মুনির, নেতেনয়াহুদের কাছে।
আমেরিকা এখন ‘আমেরিকা গ্রুপ’ তৈরির খেলায় মেতেছে যেখানে একইসঙ্গে জায়গা পাচ্ছে ‘জঙ্গি-পোষক’ দেশ আর ‘জঙ্গি-বিরোধী’ দেশ। একদিকে পাক সেনাপ্রধানের শান্তি-প্রেম, অন্যদিকে নেতানিয়াহুর যুদ্ধ তাণ্ডব আর দু’জনেই ট্রাম্পকে শান্তির দূত ঘোষণা করছেন। এখনে প্রশ্ন উঠছেই “আসলেই কি এটি জিও পলিটিক্সের মাস্টারপ্ল্যান, না নিছকই বোকামি?” শান্তির নামে দ্বিচারিতা, যেখানে আছে শুধুমাত্র শুল্ক আর নিষেধাজ্ঞার চাবুক। একসময় ওবামা নিউক্লিয়ার অস্ত্রবিস্তার রোধের দোহাই দিয়ে নোবেল পেয়েছিলেন। ট্রাম্প তো উল্টে ‘যুদ্ধ বাড়ানো’ আর ‘শুল্ক বাড়ানো’ তেই শান্তির নতুন সংজ্ঞা খুঁজছেন। প্রসঙ্গত এখন ট্রাম্প যদি এভাবে নোবেল শান্তি পুরষ্কারের জন্য মনোনয়ন পেতে থাকেন, তাহলে অদূর ভবিষতে উত্তর কোরয়ার ডিক্টেটর কিম জং উনও মনোনয়ন চাইতে পারেন, তিনি দাবি করতেই পারেন শান্তি পুরষ্কার।
দুনিয়ার নতুন শান্তির বাণিজ্যে পুরস্কারটাও বোধহয় একটু পাল্টানো দরকার। নামটা হওয়া উচিত ‘নোবেল পিস উইথ পাওয়ার’। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে বড় নাম আর দামী বৈঠকই আসল শান্তির মাপকাঠি। নোবেল কমিটি শেষমেষ কতটা শান্ত থাকেন এই ‘শান্তির দূত’কে পুরস্কার দিতে সেদিকেই নজর।
