তাপস মহাপাত্র
জি রাম জি বিলটি শুক্রবার মধ্যরাতে সংসদের পাস হওয়ার পরই প্রবল বিরোধীতায় নেমেছে কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলি। এই ইস্যুতে ফ্রন্টলাইন নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে তৃণমূলকে। প্রথম আপত্তি নামপকরণের পরিবর্তনে। মহাত্মা গান্ধীর জায়গায় রামকে ব্যবহার করায় একে “সামন্তবাদী” বলে অভিহিত করেছে বিরোধীরা। তারা জানিয়েছে, এই বিলে গ্রামীণ দরিদ্রদের জন্য কাজের নিশ্চয়তাকে “হত্যা” করা হল। এই বিলে সংশোধিত তহবিল কাঠামোরও বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানাচ্ছে তারা। কারণ এতে বেশিরভাগ রাজ্যকে এই প্রকল্পের অধীনে ৪০ শতাংশ মজুরি দিতে হবে। যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এই প্রয়োজনীয়তা বেশিরভাগ রাজ্যে এই প্রকল্পটিকে পঙ্গু করে দেয় কারণ বেশিরভাগ রাজ্যের কাছে আনুমানিক ৫৬ কোটি টাকার মজুরি বিল গ্রহণের জন্য আর্থিক সংস্থানের অভাব রয়েছে।
কংগ্রেস সাংসদ পি চিদাম্বরম বলেছেন, বিলটি যে নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলছে তা আসলে গরিবদের সমুলে আঘাত করে। তাঁর সাফ কথা, “এটি জীবিকা নির্বাহকে হত্যা করে… নিরাপত্তাকে ধ্বংস করে। কেন আপনি এটিকে ‘গ্যারান্টি-ভিত্তিক’ বিল বলছেন ? এর কোনও গ্যারান্টি নেই। এটি গ্রামীণ দরিদ্রদের জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা দেয় না। এর কোনও নিরাপত্তা নেই…”
মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সংসদে পাস হয়েছে এই বিল। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর স্বাক্ষরের জন্য ইতিমধ্যে তা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর বিলটি আইনে পরিণত হবে। ২০০৫ সালে কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আনা মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি প্রকল্পের জায়গা নেমে “জি রাম জি”।
এই বিলটির পক্ষে সরকার যে যুক্তি দিয়েছে তা হল- ২০ বছরের পুরনো একটি প্রকল্পকে অদক্ষ এবং দুর্নীতিতে ভরা আপডেট করার প্রয়োজনীয়তা ছিল। এটি অদক্ষ এবং দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ বলে মনে করে কেন্দ্র। এটি মনরেগায় যে ১০০ দিনের কাজের কথা বলা হয়েছিল তা বাড়িয়ে জি রাম জি ন্যূনতম কর্মদিবসের সংখ্যা বৃদ্ধির দিকেও ইঙ্গিত করেছে – “জি রাম জি”-তে করা হয়েছে ১২৫ দিন। কেন্দ্রের বিকশিত ভারতের লক্ষ্যে এই “বিকশিত ভারত-গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজিবিকা মিশন (গ্রামীণ), অথবা ভিবি-জি রাম জি আইন, যা আরও সংক্ষিপ্ত করে জি রাম জি করা হয়েছে। কেন্দ্র মনে করছে, গ্রামীণ পরিবারের জন্য আইনগত ভাবে কাজের নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি দক্ষতার সঙ্গে মনরেগার ভূমিকা নেবে। এই বিলটি লোকসভায় পেশ করেছিলেন কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ চৌহান।
এই কাজগুলি সংশ্লিষ্ট রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির দ্বারা তৈরি এবং বরাদ্দ করা হবে। যার প্রত্যেকটি এখন রাজ্যগুলির সঙ্গে ৪০:৬০ ভাগে ভাগ করে নেবে। এতে বলা হয়েছে যদি কেউ কাজ চাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে ডাক না পান তাহলে তা ভাতা হিসেবে দেওয়া হবে। সেই টাকা দেবে রাজ্য সরকার। এছাড়াও এই প্রকল্পে বছরে ৬০ দিনের ‘কোনও কাজ নেই’ বলে জানানো হয়েছে।
নতুন আইনের মূল বিষয়গুলি হল নিশ্চিত কর্মদিবস, তহবিল কাঠামো এবং তহবিল বরাদ্দের উপর থাকবে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ, যা সরকার “চাহিদা-ভিত্তিক” না হয়ে “আদর্শ” হিসাবে বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ কেন্দ্র বস্তুনিষ্ঠ প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে প্রতি বছর প্রতিটি রাজ্য কত পাবে তা নির্ধারণ করবে।
গ্যারান্টিযুক্ত কর্মদিবস জি রাম জি কর্মদিবস করা হয়েছে ১২৫ দিন। তবে তার উপর শর্ত আরোপ করা হয়েছে যা হল কেন্দ্রের রেকর্ড অনুযায়ী গ্রামীণ এলাকা নয় এমন জায়গায় এই প্রকল্প গ্রাহ্য হবে না। তহবিলের যুক্তি : মনরেগার অধীনে কেন্দ্র মজুরি এবং কাঁচামাল সহ সমস্ত ব্যয়ের প্রায় 90 শতাংশ দিত। জি রাম জি-র অধীনে এটি পরিবর্তিওন করা হয়েছে। মোট খরচের ৪০% দিতে হবে রাজ্যকে, ৬০% দেবে কেন্দ্র। তবে পাহাড়ি রাজ্য এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বেলায় এটা ১০% করা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্র দবে ৯০% আর এসব রাজ্য দেবে ১০%। যদিও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি এই ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ কেন্দ্রীয় বরাদ্দ পাবে।

কেন্দ্রের যুক্তি, আর্থিক কাঠামোর পরিবর্তন প্রতিটি রাজ্যকে তাদের অঞ্চলগুলিতে এই প্রকল্পের আর্থিক মালিকানা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করবে। তবে বিরোধীরা যুক্তি দিয়েছে যে এটি ইতিমধ্যেই রাজ্য-স্তরের ভঙ্গুর অর্থব্যবস্থার উপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। কার্যকরভাবে কাজের পরিমাণ সীমিত করে প্রকল্পের পরিধি হ্রাস করবে। কংগ্রেস এই “জি রাম জি”-কে “দরিদ্র-বিরোধী” বলে অভিহিত করেছে। সরকার জোর দিয়ে বলেছে যে এটি “অযৌক্তিক আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেবে না” এবং তহবিল কাঠামো প্রতিটি রাজ্যের আর্থিক ক্ষমতা অনুসারে দেখানো হয়েছে। তহবিল কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ এটি – কেন্দ্রের “আদর্শ বরাদ্দ” এর উপর ভিত্তি করে। প্রতিটি রাজ্য প্রোগ্রামের অধীনে যে পরিমাণ কাজ দিতে পারে তা সীমাবদ্ধ করে। এর অর্থ হল কেন্দ্র যদি চায়, তাহলে অনিয়মের অজুহাত দিয়ে তহবিল বন্ধ করে দিতে পারে।
এক্ষেত্রে গ্রাউন্ড লেভেলে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। পঞ্চায়েত স্তরে প্রোগ্রাম অফিসার দিয়ে কাজ চলবে। যা পরিবর্তন হয়েছে তা হল জি রাম জি-র অধীনে কেন্দ্র মান নির্ধারণ করবে, যার মধ্যে রয়েছে নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ। উদাহরণস্বরূপ উপকরণ, নকশা এবং বিলের বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে অর্থ প্রদানের জন্য ‘অনুমোদিত’ কাজের প্রকৃতি সীমিত করা। এছাড়াও, জি রাম জি বিল কাজকে চারটি বিভাগে ভাগ করেছে। যা হল- জল সুরক্ষা, মূল গ্রামীণ পরিকাঠামো, জীবিকা-সম্পর্কিত সম্পদ এবং জলবায়ু বিষয়ক। এখানেই বিরোধীদের ক্ষোভ যে এই বিলের ফলে কাজের পরিধি কমবে।
