তাপস মহাপাত্র
নরেন্দ্র মোদী। পুরো নাম নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী। একাধারে যিনি নন্দিত ও নিন্দিত। বহু বিতর্কের সিঁড়ি বেয়ে যিনি আজ ভারতের সর্বোচ্চ প্রশাসক। ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর যেমন ছিল অসীম লড়াই, তেমনি রাজনৈতিক জীবনেও তাঁকে পেরোতে হয়েছে বহু ঝড়ঝঞ্ঝা। জীবনের দীর্ঘ পথে বহু চড়াই উতরাই থাকলেও, তাঁর চরিত্রে ছিল লৌহ-ঋজুতা। সম্ভবত ভারতীয় রাজনীতিতে এই অদম্য চরিত্র অতীতে মেলেনি। ইন্দিরা গান্ধীকেও যদি তুলনা করা হয়, সেখানেও জেদ ও দৃঢ়তায় এগিয়ে মোদী। ’৭১-এর যুদ্ধ এক্ষেত্রে একটি বাটখারা হতে পারে।
নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত জীবনও মসৃণ নয়। ১৭ বছর বয়সে পরিবারের পছন্দে তাঁর বিয়ে হয় যশোদাবেনের সঙ্গে। যদিও খুবই অল্প সময় তিনি নিজেকে সংসার জীবনে বেঁধেছিলেন। দেশের সাধারণ নির্বাচনের সময় তিনি প্রথমবার প্রকাশ্যে বিয়ের কথা স্বীকার করেন। তিনি জন্মেছিলেন গুজরাটের মেহসানা জেলায় ছোট্ট একটি গ্রাম ভাদনগরে। তাঁর বাবার নাম দামোদারদাস মোদি এবং মায়ের নাম হিরাবা মোদি। ছয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে তিনি বড় হন। এমন এক ছাপোষা পরিবার থেকে আজকের নরেন্দ্র মোদীর উত্থান নিঃসন্দেহে রূপকথার মতো। ভাদনগর রেল স্টেশনে তাঁর বাবার ছোট্ট এক চায়ের দোকান ছিল। ছেলেবেলায় পড়ালেখার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে তিনিও চা বিক্রি করেছেন। যদিও ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনা ও বিতর্কে খুব আগ্রহ ছিল মোদীর।
দেশের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০১৪ সালের মে মাসে ভারতের ১৬তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ নেন। তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা, পরিশ্রম, কর্মদক্ষতার ও সক্রিয়র জন্য দলের গুড বুকে চলে আসেন। ২০০১ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি। মূলত তাঁর প্রচেষ্টায় সে সময় জাতীয় রাজনীতিতে ‘গুজরাট লাইন’ পরিচিত হয়। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের এই রাজ্যের শিল্পোন্নয়নে কার্যত জোয়ার এনেছিলেন। তবে একই সময়ে গুজরাটে দাঙ্গার কারণে তিনি চরমভাবে নিন্দিত হন। বলা হয়েছিল, তাঁর ইন্ধনেই ২০০২ সালে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে গুজরাট। যার ফলে এক রক্তক্ষয়ী ইতিহাস জুড়ে যায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনে। যা তাঁকে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায়ও অছ্যুত করে দিয়েছিল। যদিও এই অভিযোগ তিনি বরাবরই অস্বীকার করেছেন।
১৯৮০ সালে গুজরাটে বিজেপি দলে যোগ দেওয়ার আগে তিনি আরএসএসে প্রশিক্ষিত প্রচারক হিসেবে বহু বছর কাজ করেছেন। সুবক্তা ও দুর্দান্ত সংগঠক হিসেবে দলে তাঁর খ্যাতি বাড়ে। ২০০১ সালের জানুয়ারিতে ভূমিকম্পে গুজরাটে প্রায় ২০ হাজার মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় মোদীর পূর্বসূরিরা ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ালে রাজ্য রাজনীতিতে যে শূন্যতা দেখা দেয় সেটাই ছিল মোদীর জীবনে সবচেয়ে বড় মোড়। ২০০১ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত টানা চার বার তিনি বিজেপি শাসিত গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হন।
২০১৪ সালে কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সেই দাগ ফ্যাকাশে হতে থাকে। ক্রমেই তিনি বিভাজনের নিন্দা দূরে ঠেলে দেশের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, স্বচ্ছ ও আধুনিক ভারত গড়তে তোলার স্বপ্ন দেখাতে সচেষ্ট হন। একই সঙ্গে তিনি নজর দেন ভারতের বিদেশ নীতির দিকে। যার জন্য তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্ব কালে অনেকটা সময় বিশ্বের নানা দেশে গিয়েছেন। অন্যান্য দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ করে চলেছেন।
ভারতীয় রাজনীতিতে এমন এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়েছিল ১৯৫০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর। তার কয়েকমাস আগেই দেশের সংবিধান কার্যকর হয়েছে। ফলে নরেন্দ্র মোদী ভারতের এমন এক প্রধানমন্ত্রী যিনি জন্মেছিলেন স্বাধীনোত্তর কালে। বুধবার, ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি পা দিলেন ৭৫ বছর বয়সে।
এমন এক বর্ণময় রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বকে কলকাতার জাদুঘরে বুধবার থেকে শুরু হয়েছে মোদীর ৭৫ বছরের যাত্রাপথের প্রদর্শনী ! চলবে মহালয়া পর্যন্ত। এই প্রদর্শনীর দায়িত্বে রয়েছেন বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্যায় ও জাতীয় পরিষদ সদস্যা শতরূপা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মসূচির উপর ভিত্তি করে কী ভাবে নরেন্দ্র মোদী দেশের মানুষকে প্রাণিত করে চলেছেন, এই প্রদর্শনীর মূল বিষয় এটাই। এমনিতেই নরেন্দ্র মোদীর জন্মদিনে উদযাপনের আড়ম্বর নয়, ‘সেবাপক্ষ’ পালন করে বিজেপি।
কলকাতা ছাড়াও দেশের আরও ২২টি শহরে এই প্রদর্শনীর আয়োজন হচ্ছে। মোদীর জীবন বা কাজ নিয়ে প্রদর্শনী এই প্রথম নয়। কিন্তু যে আকারে এবং ব্যপ্তিতে এবার এই প্রদর্শনী আয়োজিত হচ্ছে, তা এই প্রথম। হবে নাই বা কেন, মোদী যে পা দিলেন ৭৫-এ !
