ওঙ্কার ডেস্ক: লোকসভায় কেন্দ্রীয় সরকারকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিলেন বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী। নির্বাচনী ব্যবস্থা ও কমিশনের গঠনতন্ত্র নিয়ে বিতর্ক চলাকালীন তিনি স্পষ্ট করেন, দেশের ভোটব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলতে হচ্ছে কারণ সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলি গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোকে দুর্বল করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে যাতে ক্ষমতাসীন পক্ষ প্রত্যক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখার সুযোগ পায়।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ নিয়ে সদ্য কার্যকর নিয়ম। তিনি অভিযোগ করেন, আগে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগকারী প্যানেলে তিন সদস্য ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী শিবিরের প্রতিনিধি এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই কাঠামো থেকে প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দিয়েছে। তাঁর দাবি, একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের উপস্থিতি থাকাটা যথেষ্ট জরুরি, কারণ তা ন্যায্যতা ও ভারসাম্যের প্রতীক। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিচারব্যবস্থাকে সরিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার চেষ্টাই এখন স্পষ্ট।
দ্বিতীয়ত, রাহুল প্রশ্ন তোলেন নতুন আইনি ধারা নিয়ে, যেখানে কমিশনারদের কার্যকালীন সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ কোনও ক্ষেত্রেই আইনি দায়বদ্ধতার আওতায় না পড়তে পারে। তাঁর মতে, এমন ‘ইমিউনিটি’ বা দায়মুক্তি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি মন্তব্য করেন, দায়িত্বে থেকে কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া গেলে জনগণের ভোটাধিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলে কংগ্রেস এই আইন ফিরিয়ে এনে দায়বদ্ধতার ব্যবস্থা পুনরায় চালু করবে।
তৃতীয় প্রশ্ন আসে নির্বাচনী তথ্য সংরক্ষণ নিয়ে। ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে স্থাপিত সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ কেন মাত্র ৪৫ দিন পর্যন্ত রাখা হবে এই প্রশ্নই তুলেছেন তিনি। রাহুলের মতে, নির্বাচনের পর অভিযোগ ওঠা স্বাভাবিক, তখন স্বচ্ছতার জন্য ওই ফুটেজ প্রয়োজন হয়। কিন্তু যে সময়ে অভিযোগ বা তদন্ত শুরু হয়, তার আগেই যদি ফুটেজ মুছে ফেলা হয় তবে স্বচ্ছতা প্রমাণের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বলেন, বিষয়টি প্রযুক্তিগত নয়, বরং রাজনৈতিক অভিপ্রায়ে তৈরি সিদ্ধান্ত।
লোকসভায় বক্তব্যের সময়ে রাহুল শুধু প্রশ্ন তোলেননি, কিছু সুপারিশও রেখেছেন। প্রথমত, ভোটার তালিকা এক মাস আগে থেকেই সব দলের কাছে মেশিন-পঠনযোগ্য ফরম্যাটে তুলে ধরার দাবি করেন তিনি। এতে ডুপ্লিকেশন, ব্যত্যয় বা বাদ পড়া নাম নিয়ে আগেভাগেই যাচাই সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে ব্যবহৃত ইভিএমের নিরাপত্তা ও তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, স্বচ্ছতা থাকলে কোনো প্রশ্নই ওঠে না, আর প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর দেওয়ার জায়গা তৈরি হওয়া জরুরি।
সংসদের ভেতরে রাহুলের বক্তব্যের সুর ছিল ক্ষুব্ধ, তবে যুক্তিগুলি ছিল স্পষ্ট। তিনি বারবার বলেছেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু নির্বাচন ব্যবস্থার কাঠামো বিশ্বাসযোগ্য না থাকলে গণতন্ত্রের ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যায়। বিরোধী দলগুলির বড় অংশ তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করলেও সরকারপক্ষ পাল্টা অভিযোগ তুলেছে যে রাহুল বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এখন দেখা যাবে কেন্দ্র কী ব্যাখ্যা দেয় এবং সংসদের আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচনী কাঠামোর বিষয়ে নতুন সিদ্ধান্ত আসে কি না।
