কুশল চক্রবর্তী
গত ৫ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ভারতীয় ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার নিয়ামক সংস্থা রিসার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, ব্যাঙ্কগুলোকে দেওয়া টাকার উপর থেকে প্রাপ্য সুদের পরিমান কমিয়ে দিল। সোজা কথায় রিসার্ভ ব্যাঙ্ক ব্যাঙ্কগুলোকে বাবসা করার জন্য যে ঋণ দেয় তার উপর থেকে ধার্য সুদ ৫ শতাংশ কমিয়ে দিল। কারণ হিসাবে আরবিআই বলল, ভারতে জিনিসপত্রের দাম এখন বেশ কম আছে, আর বাবসা বাণিজ্যে একটু ধীর গতি দেখা যাচ্ছে। অতএব ব্যবসা বাণিজ্যে গতি আনতে ধারের উপর সুদের পরিমান কমানো হল। এই কম সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারটা এখন থেকেই সব ব্যাঙ্ক চালু করবে। অর্থাৎ কিনা ঋণ নিলে এখন ঋণ গ্রহীতারা কম সুদে টাকা পাবে। প্রকারান্তরে কিন্তু আরবিআই মেনে নিল যে আমেরিকার শুল্ক নীতি ভারতের বাণিজ্যে মুশকিলের সৃষ্টি করেছে। আর এর সঙ্গে জুড়েছে বিশ্ব জুড়ে এক অনিশ্চিত পরিস্থতি। অবশ্যই বলেনি ভারতীয় পররাষ্ট্র নীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে কোনও কথা, যা কিনা এই অনিশ্চয়তার হয়ত একটা কারণ হলেও হতে পারে। আর এই রিসার্ভ ব্যাঙ্কের এই রেপো রেট কমা মানেই ভারতীয় ব্যাংকের কাছে চিন্তার কারণ।
ব্যাঙ্কের বাবসা চলে মুলত গ্রাহককে ধার দেওয়া আর গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা জমা নেওয়ার মধ্যে দিয়ে। গ্রাহকের কাছে থেকে ব্যাঙ্ক টাকা নেয় নির্দিষ্ট পরিমান সুদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর গ্রাহককে ঋণ দেয় তার কাছ থেকে সুদ পাবে বলে। ব্যাঙ্ক অবশ্যই জমার উপর গ্রাহককে যে সুদ দেয় তার থেকে বেশী সুদ নেয় ঋণ গ্রহিতার কাছ থেকে। এই দুই সুদের পার্থক্যই ব্যাঙ্কের লাভ নির্ধারণ করে। একে ব্যাঙ্কের ভাষায় বলে “নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন”। এখন আরবিআই শিল্পপতি বা ঋণ গ্রাহকদের সুদ কমিয়ে দিল, যাতে কিনা তারা আরও বেশী ঋণ নিয়ে উৎপাদনে গতি আনে, আর বাজারের লেন দেন আরও বাড়ে। কিন্তু ব্যাংকের বিড়ম্বনা হল এই যে ব্যাঙ্ক যদি ঋণের উপর প্রদেয় সুদ কমিয়ে দেয় আর জমার উপর সুদ একই রাখে তবে তার লাভ কমে যাবে। আর যদি গ্রাহকের জমার উপর সুদ কমিয়ে দেয়, তবে গ্রাহকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ব্যাঙ্কে টাকা না রেখে মিউচুয়াল ফাণ্ড বা অন্যত্র যেখানে আরও বেশী সুদ পাবে সেখানে টাকা সরিয়ে নিয়ে যাবে, তাহলে ব্যাঙ্কের লগ্নিযোগ্য অর্থের অভাব দেখা দেবে।
বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যাঙ্কে ডিপোসিটের পরিমান কমে যাচ্ছে। গত অর্থবর্ষে মানে ২০২৪-২৫ সালে ব্যাঙ্কের ডিপোসিটের বৃদ্ধির পরিমান ছিল ১০.৬ শতাংশ আর এবছরে সেই বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়িয়েছে ১০.২শতাংশ। মনে রাখতে হবে এবার আরবিআই সিআরআর কমিয়ে ব্যবসা করার জন্য অনেক বেশী টাকা ব্যাঙ্কের হাতে তুলে দিয়েছে। অন্য দিকে তাকিয়ে দেখুন মিউচুয়াল ফান্ডে টাকা রাখার পরিমান এই অর্থবর্ষে (২০২৫-২৬)-এর মধ্যেই বেড়েছে ২০শতাংশের উপরে। এবং এই যে মিউচুয়াল ফান্ডের বাড় বাড়ন্ত তার উপর কি ব্যাঙ্কের হাত নেই ? তার সত্যতা যে কোনও গ্রাহক যে কোনও ব্যাঙ্কের শাখায় গেলেই বুঝতে পারবেন। অন্যদিকে এই যে রেপো রেট কমিয়ে শিল্পে বা সার্ভিস সেক্টরে বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে তাকেও কি সন্দেহের বাইরে রাখা যায় ? কারণ কয়েকদিন আগেই খবরে প্রকাশ পেয়েছে টাটা গ্রুপ অফ কোম্পানিকে কেন্দ্রীয় সরকার সেমিকন্ডাক্তার তৈরির অনুমতি দেবার পরই দেখা যায় তাদের পক্ষ থেকে বিজেপির তহবিলে ৭৫৮ কোটি টাকা অনুদান চলে গেছে। তাহলে এটা আশঙ্কা করলে একবারে ভুল হবে কি, শিল্প বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন শিল্পপতিদের প্রদেয় ঋণের পরিমান বাড়লেও, ব্যাঙ্কের কম সুদের ঋণের ফলে, ব্যাঙ্ককে অন্য আয়ের রাস্তা খুঁজতে হবে না তো ? আর কম সুদে ঋণ পেয়ে শিল্পপতিদের বাবসা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার পরিচালনায় জড়িত রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিল আরও স্ফীত হয়ে উঠবে না তো ?
