কুশল চক্রবর্তী
কেন্দ্রীয় সরকার এক আদেশ বলে গত ৪ অক্টোবর, ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোতে উচ্চপদে নিয়োগের জন্য প্রাইভেট ব্যাঙ্ক বা অন্যান্য অনুরূপ ধরনের সংস্থার লোকেদের সুযোগ দেওয়ার রাস্তা খুলে দিল। এতদিন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সর্বোচ্চ বা তার কাছাকাছি পদে আসীন হতে গেলে, হয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বহুদিন কাজ করতে হত, বিশেষ ভাবে ওই বাঙ্কেই অথবা সরকারের কোনও সংস্থায় উচ্চপদে অনেক দিন কাজ করার অভিজ্ঞতার দরকার ছিল।
সরকারের অভিমত এই যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে, প্রাইভেট ব্যাঙ্ক বা অন্য বেসরকারি অর্থনৈতিক সংস্থার লোকেদের প্রবেশের কারণ হচ্ছে ব্যাংকের কাজে গতি আনা, লাভ বাড়ানো ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যাবহারের দিকে নিয়ে যাওয়া। তাহলে সরকার মনে করছে, এখন যাঁরা ব্যাংকের উচ্চপদে আছেন তারা এই ব্যাপারটা ভালোভাবে পরিচালিত করতে পারছেন না। অবাক হবার মত ব্যাপার হচ্ছে, এই লোকগুলোই কিন্তু দিনের পর দিন সরকারের নানা স্কিমকে বাস্তবায়িত করে কোটি কোটি টাকা লাভ তুলে দিচ্ছে সরকারের ঘরে। এই আইনের প্রথম প্রভাব হয়ত পড়তে চলেছে ভারতের সর্ববৃহৎ ব্যাঙ্ক ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার উপর। কারণ কিছু দিনের মধ্যেই তাদের এম ডি অবসর গ্রহণ করছেন। তাঁরর জায়গায় যাঁকে নেওয়া হবে, তার জন্য সুযোগ দেওয়া হবে প্রাইভেট সংস্থার কোনও কর্মীকেও।
অথচ এতদিনের প্রথা অনুযায়ী ভারতীয় ষ্টেট ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদ চেয়ারম্যান বা চেয়ারপারসন হয় সাধারণত ব্যাংকের আজীবন কাজ করা কোনও লোক অথবা ভারত সরকারের অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকা উচ্চপদস্থ কোনও মানুষ। ১৯৫৫ সালে ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া গঠন হওয়ার পর ষ্টেট ব্যাংকের প্রথম যে চারজন চেয়ারম্যান হন, উনারা হলেন যথাক্রমে জে মাথাই (অর্থনীতিবিদ), ভি আর লেঙ্গার (আই সি এস), পি সি ভট্টাচার্য (আই এ এ এস) আর বোড়া ভেঙ্কাটাপ্পা (আই সি এস), ভি টি দেবাজিয়া (আই সি এস)। অর্থাৎ কিনা এঁদের সকলের সঙ্গেই ভারত সরকারের কাজের নিবিড় যোগাযোগ ছিল। এরপর অনেক দিন পর, ১৯৮৫ সালে আবার সরকার ব্যাংকের বাইরের এক ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান করেন। তার নাম ডি এন ঘোষ, যিনি কিনা ছিলেন ইন্ডিয়ান অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট সার্ভিসের অভিজ্ঞ অফিসার। অতএব এটা সহজেই বোঝা যাচ্ছিল সরকারি ব্যাকের কাজকর্ম বুঝতে যে একজন সরকারের কাজকর্মের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা লোকের দরকার, সেটাই ছিল নিয়ম।
এবার সরকারের এই ভিন্ন পদক্ষেপ আইনত ঠিক কি বেঠিক সেটা দেখবে বিচারালয়। কিন্তু ষ্টেট ব্যাংকে বহু দিন কাজ করা মানুষদের সঙ্গে কথা বলে এটা বলা যেতেই পারে যে একটা সংস্থাকে বুঝতে গেলে এবং কাজ করতে গেলে, তার সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরে তৃণমূল স্থরের সঙ্গে পরিচয় থাকতে হয়। ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল, ভারত সরকার ষ্টেট ব্যাংকের সঙ্গে তাদেরই পাঁচটি এসোসিয়েটেড ব্যাংকের আর ভারতীয় মহিলা ব্যাংকের মিলন ঘটিয়েছিল। সেই সময় যাঁরা ওই এসোসিয়েটেড ব্যাঙ্ক থেকে ষ্টেট ব্যাংকে কাজ করতে এসেছিলেন, সেই সব ব্যাংকের উচ্চপদস্থ অফিসাররা পর্যন্ত নিজদের নতুন ব্যাংকের সঙ্গে মানিয়ে নিতে খুব অসুবিধায় পড়েছিলেন। অন্য দিকে ষ্টেট ব্যাংকে যারা সরাসরি অফিসার পদে চাকরি করতে আসেন তাদের ব্যাংকের প্রতি গভীর আনুগত্য, কাজের প্রতি মননশীলতা ও নিষ্ঠার মধ্যে স্বাভাবিক ভাবে জন্মাতে পারে ব্যাংকের এম ডি বা চেয়ারম্যান হবার স্বপ্ন। ভাবুন এইসব পদ যদি বাইরের কোনও কোম্পানির লোকের হাতে চলে যায় তাহলে পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে ! যে সমস্ত অভিজ্ঞ ও যোগ্য মানুষ যাঁরা কিনা ব্যাংকের স্বার্থে নিজেদের উজাড় করে কাজ করেছেন, তাঁদের মত কর্মচারীদের কি স্বপ্ন ভঙ্গ হবে না ?
এমন কী হল ! সরকারকে এই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে ! কেন্দ্রের এই সরকার বিগত ১১ বছরের কার্যকালে ২৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংখ্যা নামিয়ে এনেছেন ১২টি। এবার হয়ত সরকার ঘুরপথে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলোর উচ্চপদে বাইরের লোক, মানে তিনি হয়তো কাজ করেছেন আদানি, আম্বানি বা অন্য কোনও প্রাইভেট ফিনান্স কম্পানিতে, এমন কাউকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদে আনার বন্দবস্ত করে অন্য ভাবে ব্যাংককে পরিচালিত করতে পারেন ? তাতে একটা আশংকা থেকে যাবে, যে বিশ্বাস, নির্ভরতা বা সুযোগ সুবিধাগুলো আপামর গ্রাহক এইসব রাষ্ট্রায়ত্ত বাঙ্কগুলোতে এখন পাচ্ছে, তা আগামীদিনে পাবে কিনা ? সর্বপরি, ১৯৬৯ সালে ভারতীয় ব্যাংকগুলোকে যে বিত্তশালী মানুষের করাল গ্রাস থেকে বার করে আনা হয়েছিল, প্রকারান্তরে তা আবার ফিরে আসবে না তো ?
