RG KAR rape case
H- আরজি করের চিকিৎসক ছাত্রী খুনের এক বছর; এখনও অজানা বহু প্রশ্ন, ফের উত্তাল নাগরিক সমাজ
ওঙ্কার ডেস্ক: ২০২৫ এক বছর আগে, ২০২৪ সালের এই দিনে, কলকাতার অন্যতম সরকারি মেডিক্যাল কলেজ আরজি করের চতুর্থ তলার সেমিনার হলে মিলেছিল এক তরুণী চিকিৎসক পড়ুয়ার রক্তাক্ত দেহ। ঘটনার শুরুতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করেছিল কলকাতা পুলিশ। সেসময় থেকেই উঠেছিল তদন্তে গাফিলতি ও ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ। নির্যাতিতার পরিবারের দাবি ছিল— এটি পরিকল্পিত ধর্ষণ ও খুন। সেই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই পথে নেমেছিল নাগরিক সমাজ, রাজ্যজুড়ে হয়েছিল মোমবাতি মিছিল, অনশন, এবং সরকারি হাসপাতালের জুনিয়র চিকিৎসকদের টানা কর্মবিরতি।
এক বছরের মাথায় ফের আন্দোলনের ডাক দিয়েছে একাধিক সংগঠন। ৯ অগস্টে ‘নবান্ন অভিযান’-এর পাশাপাশি ১৪ অগস্ট ‘রাত জাগো’ কর্মসূচি ঘোষণা হয়েছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট জানিয়েছে, ৮ অগস্ট রাত ৯টা থেকে ৯ অগস্ট সকাল ৯টা পর্যন্ত মশাল মিছিল, প্রতিবাদী সমাবেশ-সহ একগুচ্ছ কর্মসূচি পালন করা হবে।
ঘটনার তদন্তে প্রথমে কলকাতা পুলিশ সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে গ্রেফতার করলেও পরে মামলার তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে যায়। ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর কেন্দ্রীয় সংস্থা চার্জশিটে সঞ্জয়কেই দোষী চিহ্নিত করে। চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি শিয়ালদহ আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। কিন্তু নির্যাতিতার পরিবার সঞ্জয়ের ফাঁসির দাবি জানিয়ে এবং অন্য অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার জন্য সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছে। সিবিআইও সঞ্জয়ের মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানিয়েছে। অন্যদিকে সঞ্জয় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বেকসুর খালাসের জন্য কলকাতা হাইকোর্টে আবেদন করেছেন। সেপ্টেম্বর মাসে এই সব মামলার একসঙ্গে শুনানি হবে বলে জানা গিয়েছে।
নির্যাতিতার পরিবার অভিযোগ করেছে, ঘটনার দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁদের তিনবার ফোনে তিন রকম তথ্য দিয়েছে এবং প্রথমে দেহ দেখতে না দিয়ে দীর্ঘক্ষণ বসিয়ে রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি বডি রিলিজ এবং দ্রুত সৎকারের মতো বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একটি অডিও ক্লিপে ‘আত্মহত্যা’র প্রসঙ্গ শোনা গিয়েছে, যদিও তার সত্যতা যাচাই হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টে কলকাতা পুলিশের জমা দেওয়া রিপোর্টে বলা হয়, ৯ অগস্ট সকাল ১০টা ১০ মিনিটে টালা থানায় খবর পৌঁছায়। আধ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়, সকাল ১১টায় আসে হোমিসাইড শাখা, ১২টা ২৫ মিনিটে ভিডিওগ্রাফার এবং ১২টা ৪৪ মিনিটে মেডিক্যাল অফিসার মৃত ঘোষণা করেন। দুপুর ১টা ৪৭ মিনিটে ইউডি মামলা রুজু হয়, বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটে বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট নির্দেশ দেন এবং ৪টা ১০ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। বিকেল ৫টায় দেহ মর্গে পাঠানো হয় এবং ৬টা ১০ থেকে ৭টা ১০ পর্যন্ত ময়নাতদন্ত হয়। রাত ৮টায় ডগ স্কোয়াড আসে, ৮টা ৩০ থেকে ১০টা ৪৫ পর্যন্ত বাজেয়াপ্তির কাজ চলে এবং রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে এফআইআর দায়ের হয়। এই রিপোর্ট দেখে শীর্ষ আদালত প্রশ্ন তোলে, ময়নাতদন্তের আগেই পুলিশ কীভাবে নিশ্চিত হল এটি অস্বাভাবিক মৃত্যু, আর সকাল ৯টার ঘটনার এফআইআর দায়ের হল রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে কেন। অধ্যক্ষ কেন এফআইআর করেননি, তাঁকে বাধা দিচ্ছিল কে সেই প্রশ্নও তোলা হয়।
তদন্ত চলাকালীন দুর্নীতি ও ধামাচাপার অভিযোগে আরজি করের তৎকালীন প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার অফিসার ইনচার্জ অভিজিৎ মণ্ডলকে গ্রেফতার করে সিবিআই। তবে চার্জশিট দাখিলে দেরি হওয়ায় অভিজিৎ মণ্ডল জামিন পান।
এই পরিস্থিতিতে এক বছরের বিচারহীনতার প্রতিবাদে ফের একজোট হচ্ছে সমাজের বিভিন্ন স্তর। অভয়া মঞ্চ, জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট-সহ একাধিক সংগঠন ২৬ দফা প্রশ্ন ও ন্যায়বিচারের দাবিতে রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে। তাঁদের আহ্বান খুন, ধর্ষণ ও রাহাজানির বিরুদ্ধে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে রাস্তায় নামতে হবে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এক হতে হবে। তাঁদের প্রশ্ন, এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের আসল সত্য কেন এখনও অজানা এবং তা আর কতদিন চাপা থাকবে।
